১০টি কাজ যা করলে নিজেই নিজেকে সম্মান করতে পারবেন

নিজেকে সম্মান করা – খুব অদ্ভুত লাগে না শুনতে? আদর্শলিপিতে একটি কথা ছিল, ‘অপরকে সম্মান করিবে’। নিজেকে সম্মান করার কোনো বিষয় সেখানে ছিল না। অথচ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজের সম্মান করাটাই অনেক বড় একটা ব্যাপার। সবাই সেটা পারে না, অনেকে হয়তো জানেও না এ বিষয়ে। নিজের আত্মউন্নয়নের জন্য, নিজেকে জানার জন্য, নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা গড়ে তোলার জন্য নিজেকে সম্মান করাটা খুব জরুরী। প্রত্যেক মানুষ আলাদা, প্রত্যেক মানুষের পরিবেশ পরিস্থিতি আলাদা, নিজেকে সম্মান করার কায়দাও আলাদা। তবু কিছু কিছু কাজ আছে যার মাধ্যমে আরো বেশি করে নিজেকে সম্মান করা যায়। এবার তাহলে সেই কাজগুলি সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক :

 

১. নিজের ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোকে উপলব্ধি করুন

 

আমরা সবসময় জীবনের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিই। কেন ভুল হয়েছিল, দোষ কার ছিল, কি করলে ভুল এড়ানো গেলেও যেতে পারতো এমন ভাবনা আমরা প্রতিনিয়ত ভাবছি। অথচ জীবনের সাফল্যগুলো, ছোটো কিংবা বড় যেকোনো প্রাপ্তি থেকেও কিন্তু শিক্ষা নেওয়া যায়। একটা লিস্ট বানিয়ে ফেলুন, কোন কোন প্রাপ্তির জন্য আপনি নিজের উপর গর্ববোধ করেছিলেন। এতে করে যেমন নিজের যোগ্যতা, অর্জন, অবদান সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায় তেমনি নিজের প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির ব্যাপারটাও মাথায় থাকে। এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তা পরবর্তীতে পুনরায় আপনাকে অনুরুপ ভালো করার উৎসাহ যোগায়।

 

এই বিষয়টা কিন্তু আত্বমুগ্ধতা নয় বরং আত্বউপলব্ধি, আত্বউন্নয়ন।

 

অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা অবশ্যই নিবো কিন্তু তাই বলে আফসোস কিংবা নিজের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত গুলোর জন্য নিজেকে আর ছোট করবো না, কারন শেষ কথা কিন্তু একটাই। আমরা সবাই মানুষ, তাই আমরা ভুল করবো এটাই স্বাভাবিক এবং অবশ্যই সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিবো। তাই অতীতের ভারে কুঁজো হওয়ার চেয়ে নিজেকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য উদ্বুদ্ধ রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর সেটা তখনই সম্ভব যখন আমরা নিজেকে, নিজের কাজকে মূল্য দেওয়া, নিজের ছোটো ছোটো প্রাপ্তি গুলোকে উপলব্ধি করতে শিখবো।

 

২. নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস করুন

 

ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ডায়েরী লেখার অভ্যাস আস্তে আস্তে কমে আসছে। হাত বাড়ালেই বন্ধু, স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতের বন্ধু যদি নাও মেলে তবু সমস্যা নেই, ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথে ভাগ করে নেই নিজের সুখদুঃখ। তার চেয়ে বরং ডায়েরি লিখুন, পাতায় পাতায় উঠে আসুক দিনের যত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, গুরুত্বহীন আলাপ। পাতা উল্টানোর সময় করে যদি উঠতে নাই পারেন, তাহলে বেছে নিন মোবাইলের নোটপ্যাড। এতে সময়ের সাথে সাথে আচরণ ও চিন্তাভাবনার পরিবর্তন জানতে পারবেন সহজেই। তবে বলা বাহুল্য, ডায়েরির মাধ্যমে আপনি যেভাবে নিজেকে ব্যক্ত করতে পারবেন, নোট প্যাড থেকে সেরুপ আশা করা ব্যর্থ।

 

KEEP A NOTEBOOK. Travel with it, eat with it, sleep with it. Slap into it every stray of thought that flutters up into your brain. Cheap paper is less perishable than gray matter, and lead pencil markings endure longer than memory.” – Jack London

 

নিজের অনুভূতিগুলোকে, চিন্তাধারাকে দিনশেষে যখন ডায়েরিতে তুলে ধরবেন, অবাক হয়ে উপলব্ধি করবেন যে আপনার নিজের কাছে আপনার একধরনের জবাবদিহিতা চলে আসছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে আপনি আপনার নিজের সাথেই একধরনের স্বচ্ছতা তৈরি করে ফেলেছেন। যখন স্বচ্ছতা চলে আসে, নিজের প্রতি সম্মানটাও কিন্তু দৃঢ় হয়।

 

৩. অতীতের ভুলের জন্য নিজেকে মাফ করে দিন

 

অতীতকাল যত বড় কালই হ’ক নিজের সম্বন্ধে বর্তমান কালের একটা স্পর্ধা থাকা উচিত। মনে থাকা উচিত তার মধ্যে জয় করবার শক্তি আছে।  -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

পুরানো ভুলভ্রান্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক। অতীতের ভুল জন্ম দেয় অহেতুক কিছু অনুশোচনা, কিছু অনাবশ্যক অনুতাপ। যে অতীত আর কখনো ফিরে আসবে না, তার জন্য দু:খ করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। আমরা বর্তমানে বাঁচি। অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া যায়, অতীত আঁকড়ে আর যাই হোক বেঁচে থাকা যায় না। তাই পুরানো ভুলভ্রান্তির জন্য নিজেকে দোষ না দিয়ে বর্তমানকে নিয়ে বাঁচতে শিখুন। যা গেছে তা তো গেছেই, যা সামনে আছে তাই নিয়ে এগিয়ে যান। অতীতের সব আফসোসকে বিদায় দিয়ে নিজের বর্তমানকে যখন স্বীকার করে আপন করে নিবেন, নিজের অজান্তেই নিজের চোখে নিজের অবস্থানকে আর দৃঢ় পাবেন।

 

৪. নিজের শখের উপর গুরুত্ব দিন

 

শখ আহ্লাদ জীবনের অক্সিজেনের মতোন। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার জন্য এর চেয়ে ভাল উপায় আর হয় না। নিজের শখের পিছনে সময় দিলে তা আপনাকে টাকা পয়সা না দিক, মরুভূমির মাঝের মরুদ্যানের মত শান্তি দেবে, স্বস্তি দেবে। হতে পারে আপনি বই পড়তে ভালোবাসেন, হয়তো আপনার শখ দাবা খেলার কিংবা হয়তো আগ্রহ আছে গানবাজনায়।

 

যেটাই হোক, দিনের ব্যস্ত শিডিউলের ফাঁকেও চেষ্টা করুন অল্প একটু সময় খুঁজে নিতে। শখ আপনার ব্যক্তিত্ব বহন করে, আপনার নিজস্বতা তুলে ধরতে সাহায্য করে, সকলের কাছে নিজের দৃঢ় পরিচিতি তুলে ধরার মাধ্যম এটি।

 

৫. জীবনের সকল চ্যালেঞ্জ হাসিমুখে গ্রহণ করুন

 

চ্যালেঞ্জ শব্দটা আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশিবার শোনা শব্দগুলোর মধ্যে একটা, সবচেয়ে বেশিবার মুখোমুখি হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যেও একটা। যাই হোক, যে চ্যালেঞ্জই আসুক তার মোকাবেলা হাসিমুখে করুন। আপনি পারবেন কি না, এর ফলাফল কি হবে সেটা নাহয় পরে ভাবা যাবে। নিজেকে সম্মান করার জন্য নিজের উপর বিশ্বাস থাকা জরুরি। আর নিজের উপর বিশ্বাস থাকলে যেকোনো সমস্যা হাসিমুখে গ্রহণ করা যায়। সমস্যাকে ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলে সমস্যা সমাধান হবে না, সমস্যা বাড়বে। যেকোনো অসম্ভবকে আপন করে নিন, দেখাই যাক না কি হয় !

 

 

৬. প্রতিদিন কাজের বাইরেও নতুন কিছু শিখুন

 

রোজকার রুটিনে কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখুন নতুন কিছু করার জন্য, নতুন কিছু শেখার জন্য। নতুন কিছু জানার আগ্রহটা ধরে রাখুন। জীবনের একঘেয়েমি দূর করার জন্য প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চর্চা বজায় রাখুন। নতুন কিছু জানার আনন্দ জীবনে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে। তাই শুধু পহেলা বৈশাখে নয়, নতুন কিছু করার, নতুনকে বরণ করে নেয়ার প্রচেষ্টা থাকুক সারা বছর জুড়ে।

 

৭. লক্ষ্যকে সুনির্দিষ্ট করুন

 

নিজের লক্ষ্য নিজেই নির্ধারণ করুন। লক্ষ্যহীন জীবন কারো কোনো কাজে আসে না। না নিজের, না সমাজের। আর আপনি নিজেকে যতটা ভাল চেনেন, অন্য কেউ ততোটা চেনে না। তাই এই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ও দায়িত্ব একমাত্র আপনারই আছে। মা, বাবা, ভাই, বোন এরা আমাদের আত্মার আত্মীয়। তারা সবসময় আমাদের ভাল চান, আমাদের জন্য তাদের সিদ্ধান্ত অনেকটাই সঠিক। তারপরো, আপনি জীবনে কি হতে চান, কোথায় পৌছুতে চান, কোন রাস্তায় এগোতে চান এই সিদ্ধান্তটা আপনার নিজেরই নেয়া উচিত।

 

৮. পজিটিভ চিন্তা করুন

 

প্রতিদিন নিজের ব্যাপারে পজিটিভ চিন্তা করুন। সব কাজে, সবরকম চিন্তাভাবনায় পজিটিভিটি নিয়ে আসুন। নিজের উপর বিশ্বাস হারাবেন না, ‘আমি পারবই, আমাকে পারতেই হবে’ এই মূলমন্ত্র নিয়ে এগিয়ে যান। কারো সম্পর্কে অথবা কোনো বিষয় নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। পজিটিভ চিন্তাভাবনা আপনাকে বিভ্রান্ত হতে দেবে না, মানসিকভাবেও এগিয়ে নিয়ে যাবে বহুগুণ, বাড়িয়ে দেবে কাজকর্মের গতি।

 

A positive attitude causes a chain reaction of positive thoughts, events and outcomes. It is a catalyst and it sparks extraordinary results. -Wade Boggs

 

৯. অগোছালো এবং অনিয়মিত জীবনাচরণ বিরত থাকুন

 

আপনার কাজ, আপনার দৈনন্দিন কর্মের ব্যবস্থাপনা আপনি যতটা রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন, আপনার কাজ, দৈনন্দিন জীবন তততাই গোছালো হবে। নিজের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটাও বদলে যাবে। নিজেকে সম্মান করাটাও তখন কঠিন কিংবা অযাচিত বলেও কিন্তু মনে হবে না।

 

১০. নিজের জীবনের গল্প এমনভাবে তৈরি করুন যা অন্যকে অনুপ্রেরণা যোগায়

 

আপনার ভবিষ্যৎ আপনার হাতে। ভাগ্যের হাতে সবকিছু ছেড়ে দেয়ার সময় শেষ। পাশের বাসার ছেলেটার সাথে নিজের তুলনা দেয়া এবার বন্ধ করুন। এমনভাবে কাজ করুন যেন সবাই আপনাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়। অন্যের গল্প শুনে শুনে অনুপ্রাণিত হওয়ার বদলে নিজের জীবনের গল্প দিয়ে সবাইকে অনুপ্রাণিত করুন। কাউকে আদর্শ মেনে কাজ করা ভাল, কিন্তু আদর্শকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য থাকা আরো ভাল। নিজের ভাল ভাল কাজের সম্পর্কে অন্যদের জানান; নিজের দাম বাড়ানোর জন্য না, আপনার অভিজ্ঞতা জেনে তারাও যেন ভাল কাজে উদ্বুদ্ধ হয় তার জন্য।

 

নিজেকে সম্মান দেয়ার অর্থ হামবড়া ভাব ধরে ঘুরে বেড়ানো নয়। নিজের সম্বন্ধে বড় বড় কথা বলে নিজেকে জাহির করাও নয়। নিজেকে ভালোবাসা, নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া, নিজেকে সঠিকভাবে সবার কাছে তুলে ধরা – ব্যস, এইটুকুই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *