সিদ্ধান্তহীনতা কাটিয়ে এগিয়ে যাবেন সহজেই

মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়

আড়ালে তার সূর্য হাসে,

হারা শশীর হারা হাসি

অন্ধকারেই ফিরে আসে। – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

 

দৈনন্দিন জীবনে নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে আমাদের পথ চলতে হয়। আর চলতে গিয়ে নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ধাপে ধাপে দোটানায় পড়া খুব অবাক কিছু না। তবে দুই নৌকায় পা রেখে বেশি দূর আগানো যায় না, তাই বেছে নিতে হয় যেকোন একটি পথ। এই বেছে নেওয়ার অঙ্কটা খুব সহজ নয়। জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দিশেহারা হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ।

 

কেমন করে নিতে হয় কঠিন সিদ্ধান্ত? কিভাবে প্রস্তুত করতে হয় নিজেকে? আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা কেমন মানুষ তা যেমন নির্ধারণ করে তেমনি আমাদের ভবিষ্যতের উপরও প্রভাব ফেলে। তাই আসুন জেনে নেই কিভাবে ১০টি সহজ উপায় অবলম্বন করলে আপনি সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বের হয়ে একজন সফল মানুষের মত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

 

১। বিষয়টা আগে বুঝে নিন

 

যেকোন সমস্যায় আমরা পুরোপুরি বিষয়টা না জেনেই সমাধান খুঁজতে শুরু করে দেই। সব সমস্যা একবারে সুরাহা করার চেয়ে সেটাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিয়ে সমাধান করাই শ্রেয়। শুধু সেটাই না আমাদের সিদ্ধান্ত যেহেতু আমাদের কাছের মানুষের জীবনেও একটা প্রভাব ফেলে, তাই সেই দায়িত্ববোধকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। সুতরাং কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টির আগাগোড়া খুব ভালো করে জেনে নিন। তাহলে বিষয়টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া আপনার জন্য অনেক সহজ হবে।

 

২। অভিজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলুন

 

যার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে বা একই পরিস্থিতিতে পড়েছে এমন কারো সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। কেননা একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা আপনাকে সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রচণ্ড সহায়তা করবে। ফলে সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়, তবে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাহায্য করে।

 

৩। সমাধান খুঁজুন

 

কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা মনস্থির করার জন্য প্রতিটি মানুষেরই নিজের একটা পদ্ধতি থাকে। কাজেই বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে আগে আপনি আপনার  নিজের চেনা পথটাই বেছে নিন। তাহলে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা আপনার জন্য অনেক সহজ হবে। তথ্য দিয়ে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং আপনার মন কতটা সায় দিচ্ছে – সেটা বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।

 

কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে নিজেকে বারবার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন। আর তাই যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বড় পরিসরে সেটার ফলাফলের প্রভাব চিন্তা করুন, যাচাই করে নিন ভালোভাবে। নিজের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলে তবেই সিদ্ধান্ত নিন।

 

৪। নিজেকে প্রশ্ন করুন

 

একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন করা উচিত। যেমন এই কাজটা না করলে পস্তাব কিনা, কি নিয়ে ভয় পাচ্ছি, মন কি বলছে, কিসের জন্য করছি, কার জন্য করছি, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত পরিবর্তনগুলো মেনে নিতে পারব কিনা, সিদ্ধান্ত কাজ না করলে তখন করণীয় কী হবে, ইত্যাদি।

 

আরও পড়ুনঃ ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য প্রতিদিন নিজেকে বলুন ৮টি কথা

 

৫। ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন না

 

You can’t make decisions based on fear and the possibility of what might happen.” ― Michelle Obama

 

ভয়ের কারণে বা ভয় পেয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আবার ভয়টাকে অবহেলাও করবেন না। কেননা এতে ঝুঁকি বেড়ে যায়। একটি প্রতিষ্ঠানে থাকা অবস্থায় বেশি বেতনের চাকরির অফার পেলেন। কিন্তু বেশি বেতনের সাথে সাথে কাজের চাপটাও বেড়ে যাবে দিগুণ। পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কী করবেন? ভয় না পেয়ে আপনার সুযোগ সুবিধাগুলো ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করে দেখুন। এরপর সিদ্ধান্ত নিবেন।

 

 

৬। কঠিন সিদ্ধান্ত দেরিতে নিন

 

হুট করেই যে কোন কঠিন সিদ্ধান্ত নিবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। বরং কঠিন সিদ্ধান্ত মনে হলে বিষয়টা নিয়ে ভাবা একেবারেই ছেড়ে দিন। মনকে মনের মত থাকতে দিন। তাহলে কিছুদিন পর আপনা থেকে বুঝতে পারবেন যে আপনাকে কী করতে হবে। সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হলে প্রধান প্রধান বিষয়ে যেমন নজর দেওয়া উচিত তেমনি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সময় দেওয়া উচিত।

 

৭। বিকল্প উপায় খুঁজুন

 

সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অবশ্যই আপনাকে কিছু ধাপ পার হতে হবে, তা হলো, লক্ষ্য সুনির্দিষ্টভাবে স্থির করা। বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করা। অনেক বিকল্প তৈরি করা। বিকল্পগুলোর মূল্যায়নও একটি বেছে নেওয়া। বেছে নেওয়া বিকল্পটি বাস্তবায়ন করা।

 

৮। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখুন

 

“It is in the moments of your decision that your destiny is shaped” – Tony Robbins

 

কেবল বর্তমানকে ভেবে সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাহলে বিপদে পড়তে পারেন। বরং ভবিষ্যতের হিসাব করে তবেই সিদ্ধান্ত নিন। এতে আপনার জন্যই ভালো হবে। যেকোনো সিদ্ধান্ত কেবল একটি জিনিসের ওপরই প্রভাব ফেলেনা। প্রভাব ফেলে আরো অনেকগুলো ব্যাপারের ওপর যেগুলো সেই কাজটির সাথে জড়িত। আর তাই যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বড় পরিসরে সেটার ফলাফলের প্রভাব চিন্তা করুন। আপনার বাকি সব পরিকল্পনায় কতটা সমস্যা সৃষ্টি করছে সেটি যাচাই করে নিন ভালোভাবে।

 

৯। আবগের বশে কিছু করবেন না

 

যেকোন ব্যাপারে চট করে নেওয়া প্রথম সিদ্ধান্তটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের আবেগের প্রকাশই হয়ে থাকে। আর তাই সেটা বাস্তবতাসম্পন্ন আর বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নাও হতে পারে। তাই কোনো কিছু শোনার পরপরই যেটা মাথায় আসবে সেটা না করে নিজেকে একটু সময় দিন। প্রথমেই কোন সিদ্ধান্তে চলে আসবেন না। অন্ধ আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ গ্রহনযোগ্য নয়।

 

যে কোন সিদ্ধান্ত কখনো পারফেক্ট হয় না। এই সত্যটা মেনে নিলে দেখবেন মনের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই কমে গেছে। সেইসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াও আপনার জন্য কত সহজ হচ্ছে। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমাদের মনে সংশয় কাজ করে, সিদ্ধান্তটা ঠিক হল তো! কোন কারণে সেটা ঠিকঠাক কাজ না করলে শুরু হয় অনুশোচনা। আসলে সিদ্ধান্তের ভাল মন্দ বিষয়টা আপেক্ষিক।

 

কোন সিদ্ধান্তই শতভাগ সুফল বয়ে আনে না। সিদ্ধান্তটি ভুল না সঠিক, সে বিচার সময়ের হাতে। অনেক পরিস্থিতির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই কোন সিদ্ধান্ত ঠিকঠাক কাজ না করলে নিজেকে দায়ী করা উচিত নয়; বরং ইতিবাচকভাবে করণীয় বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া উচিত। সবাইকে খুশি করার প্রবণতা বাদ দিলে অহেতুক চাপ থেকে রেহাই মিলবে। একজনের জীবনে যে সিদ্ধান্ত সঠিক, আরেকজনের জীবনে হয়ত সেটি ভুল। সিদ্ধান্তকে তাই যার যার অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে সেটাই সফল বাস্তবায়নে চাই আত্মবিশ্বাস, আন্তরিকতা ও সাহস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *