জীবনে সুখে থাকাটা খুব বেশী প্রয়োজন

সুখী হতে আমরা কে না চাই?

কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন বলা হয় যে, মানুষ আসলে কখনোই পুরোপুরি সুখী হতে পারে না। কথাটা আংশিক সত্য বটে, তবে পুরোপুরি কি?

 

কিছু ঘটনায় মানুষের হাত থাকে না। মানুষ তার নিজের জীবনের শতভাগ ঘটনা নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না একথা সত্য। নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকে না বলে সব ঘটনায় সুখী হওয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরেও কিছু ব্যাপার থেকে যায় যেগুলো আমি-আপনি, আমরা যার যার জীবনে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

 

আর এগুলো আমাদের জীবনকে অনেকাংশেই সুখী করে তোলে। এই ব্যাপারগুলোকে আমরা কখনোই আলাদা করে তেমন একটা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু, যখন এগুলো না থাকে তখন আমরা ঠিকই বুঝতে পারি, এগুলো আমাদের জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। চলুন দেখে নেই এমনই কিছু বিষয় যেগুলো আমাদের জীবনকে সুখী করে তুলতে পারে:

 

একটি পরিবার/ জীবনসঙ্গী:

 

সুখী একটি জীবন গড়তে চাইলে পরিবার বা জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার কোন বিকল্প নেই। সারাদিন আমরা কর্মক্ষেত্রে বা বাইরের জগতে যতকিছুই অর্জন করি না কেন, দিনশেষে আমরা ফিরে আসি ঘরে, এটাই মানুষের প্রবৃত্তি। মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি, হাসি-কান্না, গ্লানি ইত্যাদি ভাগ করে নেয়ার জন্যে তার নিজস্ব মানুষের দরকার হয়। বন্ধুবান্ধব কিংবা সহকর্মী মহলে আপনি যতই জনপ্রিয় কিংবা আড্ডাপ্রিয় হোন না কেন, একান্ত নিজস্ব ব্যাপারগুলো শেয়ার করার জন্য কিন্তু আপনার প্রথম প্রয়োজন আপনার পরিবার।

 

তাছাড়া আপনার পরিবারই আপনাকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন, যেকোন সংকটে আপনাকে সবচেয়ে ভালো সাজেশন দিতে পারেন। আর এজন্যই একজন মানুষের জীবনকে সুখী করতে কিন্তু একজন যোগ্য জীবনসঙ্গী দরকার, দরকার নিজস্ব পরিবার।

 

 

মনের মত কর্মক্ষেত্র:

 

চব্বিশ ঘণ্টার দিনের একটা বড় অংশ কিন্তু আমরা কাটাই আমাদের কর্মক্ষেত্রে। জীবিকা অর্জন বলুন আর জীবনে বেঁচে থাকার কারণ বলুন, তার সিংহভাগ কিন্তু আসে এই কর্মক্ষেত্র থেকেই। আর তাই আপনার কাজের জায়গাটি আপনার মনমতো হওয়া প্রয়োজন।

যেকোন ক্যারিয়ার বেছে নেয়ার আগে সেই ক্যারিয়ারের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতাগুলো সম্পর্কে জানা ভালো। সে যোগ্যতাগুলো আপনার আছে কিনা, না থাকলে অর্জন করে নিতে পারবেন কিনা এবং সে ধরণের কাজ করতে আপনার ভালো লাগে কিনা এগুলো কাজে ঢোকার আগেই যাচাই করে নিন। এছাড়া নিজের কাজের জায়গায় সহকর্মী কিংবা বসের সাথেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করুন। কারণ দিনের একটা বড় সময় যেখকানে কাটাবেন সেখানে অশান্তি থাকলে আপনার সুখী জীবনের বারোটা বাজবেই!

 

 

কিছু ভালো বন্ধু:

 

পরিবার এবং কাজের জায়গা ছাড়াও প্রতিটি মানুষের জীবনে কিন্তু বন্ধুদের জন্যে আলাদা জায়গা থাকা প্রয়োজন। পরিবার এবং কাজের ক্ষেত্রে আপনি অনেকটা সমমনা কিংবা কাছাকাছি চিন্তার মানুষের সাথে মেলামেশা করেন। কিন্তু আপনার বন্ধুরা বিচিত্র চিন্তাভাবনা বা পরিবেশের হতে পারেন, যা আপনাকে আরো সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, জীবনে তো আনন্দ-উপভোগেরও দরকার আছে! কাজে-প্রয়োজনে, বিপদে-আপদে সবার আগে এগিয়ে আসবে আপনার বন্ধুরাই। তাই নিজের ভালো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করুন, কারণ বন্ধু ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল!

 

নিজস্ব কোন শখ বা আবেগ:

 

জীবনের সব কাজ কিন্তু আমরা আর্থিক দিক বিবেচনায় করি না। সুখ তো শুধু টাকা দিয়ে আসে না! সুখী হতে হলে আরো যা প্রয়োজন তা হল মানসিক তৃপ্তি। আর এই মানসিক তৃপ্তি পেতেই প্রয়োজন একেবারে নিজের কোন শখ। শখ যে সেই বইয়ে পড়া বাগান করা কিংবা ডাকটিকেট সংগ্রহ করাই হতে হবে, তা কিন্তু নয়। শখ হতে পারে এমন যেকোন কাজ যা আপনার করতে ভালো লাগে। তা হতে পারে ঘুরে বেড়ানো কিংবা মানুষকে সাহায্য করা অথবা স্রেফ মুভি দেখা। শখ যেটিই হোক না কেন, রুটিনের একটা নির্দিষ্ট সময় সেই শখটির জন্যে বরাদ্দ রাখুন। শখ পূরণ আপনার মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং দুঃশ্চিন্তা দূর করবে এবং আপনি একটি প্রফুল্ল জীবন পাবেন।

 

 

ভালো ঘুম:

 

শুনে হাসি পেলেও একটা সত্যি কথা হলো, সুখী হতে ভালো ঘুমের বিকল্প নেই কোন। ঘুমের অভাব আপনার মেজাজকে খিটখিটে করে তোলে, সৃজনশীলতা এবং কাজ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সারাদিন অন্যের সাথে খিট্মিট করে নিশ্চয়ই আপনি সুখী হতে পারবেন না! শুধু ঘুমের অভাব নয়, অতিরিক্ত ঘুমেও আপনার এমন সমস্যা হতে পারে। তাই ঘুম হোক পরিমিত এবং নিয়মিত!

 

 

রোমাঞ্চকর স্থানে ঘুরতে যাওয়া:

 

ঘোরাঘুরি করতে সবারই কমবেশি ভালোলাগে। কিন্তু রোমাঞ্চকর জায়গার ঘুরতে যাবার উপরি পাওনা হচ্ছে আপনি জীবনটাকে আরো বেশি ভালোবাসতে শিখবেন। যে মানুষ বিপদকে যত কাছ থেকে দেখে সেই মানুষ জীবনকে তত বেশি ভালোবাসে এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটা তার বেড়ে যায়। এছাড়া অ্যাডভেঞ্চার আপনাকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়তে শেখায়, বাধা অতিক্রমের সুখ দেয়। তাই ৫ টি জায়গায় ঘুরতে গেলে তার মধ্যে অন্তত দু’টি রোমাঞ্চকর স্থান তালিকায় রাখতেই পারেন।

 

প্রয়োজন মেটানোর জন্যে “যথেষ্ট” উপার্জন:

 

লক্ষ্য করুন, আমি যথেষ্ট কথাটির ওপর জোর দিয়েছি। জীবনের তিক্ত সত্যের মধ্যে একটি হল, আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে মনে সুখ থাকা কঠিন। তাই জীবনধারণ বা শখ পূরণের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে আয় করা কিন্তু অবশ্যই দরকার। তাই বলে “আরো চাই, আরো চাই” এর মত খাই-খাই স্বভাব কিন্তু আপনাকে কখনোই সুখে রাখবে না।

 

সেরকম হলে আপনি শুধু একটি টাকা উপার্জনের মেশিন হবেন, জীবনকে উপভোগ করতে পারবেন না এবং শেষ বয়সে গিয়ে আফসোস করতেই হবে। তাই উপার্জনকে যথেষ্ট রাখুন, এর কম বা বেশি নয়। ইংরেজিতে একটি বিখ্যাত কথা হচ্ছে, The wisest person is he who knows when to stop.

 

 

জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য:

 

ছোটবেলায় রচনা বইয়ে অনেকবার পড়েও যে কথাটিকে আমরা আমাদের জীবনে খুব একটা কাজে লাগাই না তা হলো, “লক্ষ্যবিহীন জীবন হালবিহীন নৌকার মতন”। জীবনে সুখী হতে হলে আপনাকে জানতে হবে জীবনের কাছ থেকে আপনি কী চান। নিজস্ব একটা লক্ষ্য থাকলেই আপনার পক্ষে সেটা অর্জনের জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।

 

অনুশীলন/শারীরিক ব্যায়াম:

 

ব্যায়াম শুধু আপনার শারীরিক ফিটনেসের জন্যেই না, আপনার মানসিক সুস্থতা ধরে রাখার জন্যেও জরুরি। আমরা যখন ব্যায়াম করি তখন আমাদের শরীরে এন্ডোরফিন নামের একটা হরমোন ক্ষরণ হয় এবং এই হরমোন আমাদের অবসাদ, ক্লান্তি ও বিষণ্ণতা দূর করে আত্মবিশ্বাস, স্মরণশক্তি এবং কাজ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। তাহলে বুঝতেই পারছেন, কেন সুখী হতে হলে ব্যায়াম জরুরি!

 

 

ভালো খাবার:

 

ভালো খাবার বলতে আমি কেবল বিরিয়ানী-পোলাও-কোর্মা বা চাইনিজের কথা বলছি না। ভালো খাবার মানে নিজের শারীরিক চাহিদা মেনে সুষম খাবার। আপনার ডায়েট চার্টে প্রচুর শাকসবজি, ফল এবং ফ্রেশ খাবার রাখুন। এছাড়া রাখুন পর্যাপ্ত পরিমানে প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট। ভালো খাবার আপনার শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানসিক উন্নয়নেও সাহায্য করে। বয়স বেড়ে গেলে নিয়ম মেনে খাবেন, এমন না ভেবে আগে থেকেই একটি স্বাস্থ্যকর খাবার মেন্যু অনুসরণ করুন।

 

ইতিবাচক চিন্তা:

 

আপনি যত বেশি নেতিবাচক চিন্তাকে আপনার মনে স্থান দেবেন, আপনার ব্রেইন ততই নিজেকে অসুখী ভাবতে চেষ্টা করবে। অর্ধেক খালি গ্লাসকে অর্ধেক ভরা দেখার অভ্যাস করুন। কিছু বিষয়ের উপর আমাদের হাত থাকে না, সেগুলোকে পজিটিভ ভাবে দেখার চেষ্টা করুন। যে সমস্যাটি আপনার জীবনকে অতিষ্ট করে তুলছে সেটি সমাধানে একটু ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করুন। মনে রাখা ভালো, আপনার জীবনে সুখী হওয়াটা নির্ভর করছে আপনি কীভাবে একটি সমস্যাকে সামলাচ্ছেন তার ওপর। রিয়্যাকটিভ না হয়ে প্রো-অ্যাকটিভ হোন। আপনাকে দিয়ে হবে না, আপনি পারবেন না, এধরণের চিন্তা মাথায় এলেই নিজেকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিন।

 

 

বর্তমানে বাস করুন:

 

আপনি যদি হতাশ হয়ে থাকেন, তার মানে আপনি অতীতে বাস করছেন। আপনি যদি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকেন তার মানে আপনি ভবিষ্যতে বাস করছেন। অতীত কিংবা ভবিষ্যতে নয়, বাস করুন বর্তমানে। আপনার সামনে এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি আছে সেটিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করুন, বর্তমান মুহূর্তটিকে উপভোগের চেষ্টা করুন। অতীতকে আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না, তাই অতীতকে ভেবে আপনার বর্তমান কেন নষ্ট করবেন?

 

তাছাড়া আজকের দিনটা আগামীকালই “গতকাল” হয়ে যাবে, চেষ্টা করুন যাতে আপনি আজকের দিনটিকে একটি সুখকর অতীত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। একটি একটি দিন করে বাঁচুন, সুখের পিছুতাড়া করতে হবে না আর।

 

স্মৃতি:

 

ছেলেবেলার মজার গল্প করতে করতে হেসে কুটোপাটি হন না এখনো? কিংবা অতীতের মজার স্মৃতিগুলো কি এখনো ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি এনে দেয় না? স্মৃতিরা এভাবেই আমাদের কে হাসতে, সুখী হতে সাহায্য করে। তাই, সময় পেলে স্মৃতিচারণ করুন, পুরোনো দিনের দিকে ফিরে তাকান। জীবনকে ভালোবাসতে পারবেন।

 

কোন কিছুই আপনাকে সুখী হওয়ার পুরো নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। জীবনের প্রতি আপনার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর এই ছোট ছোট ব্যাপার গুলো, সুখী হতে এইই যথেষ্ট! Walt Disney তো বলেই গিয়েছেন, Happiness is a state of mind. It’s just according to the way you look at things.

 

https://www.facebook.com/spikestoryOfficial/videos/322251351447006/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *