2437 Views

এই ডিজিটাল যুগে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব থেকে শুরু করে আজ ঘরে ঘরে স্মার্ট টিভি পর্যন্ত জায়গা দখল করে নিচ্ছে। আমরা অনেকেই নিজেদের স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করি, যার সবগুলোই বিশ্বাসযোগ্য কি না বুঝে ওঠা অনেক কঠিন। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে গড়ে উঠছে নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক। অনেকেই মনে করেন অতিরিক্ত ইন্টারনেটের ব্যবহার ডেকে আনছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। আবার অনেকেই ভাবেন নষ্ট হচ্ছে তাঁদের নিরাপত্তা। তবে নেটওয়ার্কের পরিসীমা বাড়ার সাথে সাথে আমাদের জীবন যে প্রতিনিয়ত সহজ হয়ে যাচ্ছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

 

আমরা সবাই চাই সুরক্ষিত ইন্টারনেট ব্যবহার করতে। কিন্তু অনেক সময়ই বুঝে উঠি না কোন কাজটা করা উচিত আর কোনটা না। সাইবার জগতে নিজের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হলে থাকতে হবে কিছু বেসিক টেকনিক্যাল জ্ঞান। তার মধ্য থেকেই কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

 

ফিশিং স্ক্যাম

 

Phishing অথবা ফিশিং এক ধরনের অনলাইন স্ক্যাম যাতে অপরাধীরা কোনো ভরসাযোগ্য কোম্পানির নামে ইমেইল পাঠিয়ে আপনার কাছ থেকে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য জেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। এধরনের ইমেইল বা মেসেজ দেখে সাধারণত বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়। কিন্তু এসব অপরাধীদের আপনাকে বোকা বানাতে দেবেন না। সাধারণত এগুলো বিশ্বাস করে বিপদে পড়ে যাওয়া খুব সহজ।

 

তাহলে বাঁচার উপায় কী?

 

ইমেইল বা মেসেজের মাধ্যমে আপনার ব্যাংক একাউন্ট নাম্বার অথবা পাসওয়ার্ড অথবা যে কোনো সিকিউরিটি নাম্বার চাওয়া হলে তা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। আসল কোম্পানির কাছে ইতোমধ্যেই এই তথ্যগুলো আছে এবং তারা কখনোই আপনার কাছে ইমেইলের মাধ্যমে এসব তথ্য চাইবে না। ইমেইল বা মেসেজের মাধ্যমে পাঠানো কোনো লিঙ্কে ক্লিক করবেন না। এই লিঙ্ক আপনাকে এ রকম কোনো ওয়েবসাইটে নিয়ে যেতে পারে যা দেখতে অনেকটা আসল ওয়েবসাইটের মতো মনে হবে এবং সেখানে দেওয়া আপনার তথ্য ব্যবহার করে তারা আপনার একাউন্ট হ্যাক করতে পারবে। কোনো একাউন্টে ঢুকতে চাইলে অন্য কারো পাঠানো লিঙ্ক ব্যবহার না করে ব্রাউজারে ঢুকে নিজেই ঠিকানাটি লিখুন অথবা নিজের তৈরি করা কোনো বুকমার্ক ব্যবহার করুন। মেসেজে পাঠানো ঠিকানা কপি-পেস্ট করা বা ইমেইল/মেসেজে পাঠানো ফোন নাম্বারে কল না দেওয়াই ভালো।

 

ফিশিং স্ক্যাম ধরতে পারার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে মাউস টেস্ট। আপনার কারসরটি পাঠানো লিঙ্কের ওপর ধরলেই আপনি প্রকৃত ঠিকানাটি দেখতে পাবেন। ঠিকানাটি ভালো করে পড়ুন। যদি তা আপনার যে ওয়েবসাইটে যাওয়ার কথা তার ঠিকানা না হয়, তাহলে বুঝে নিন আপনার সাথে প্রতারণা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক সময় আসল কোম্পানির নামের বানানে ক্ষুদ্র পরিবর্তন এনে তা নকল নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয় যাতে খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে তা বোঝা না যায়। “২৪ ঘণ্টার ভেতর ভেরিফাই না করলে আপনার একাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হবে” এ ধরনের মেসেজে ভয় পাবেন না। এ ধরনের মেসেজের মাধ্যমে প্রতারণা চলে আসছে অনেক দিন ধরে। যদি কোনোভাবে আপনার মনে হয় যে আপনি কোনো প্রতারককে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ফেলেছেন তাহলে সাথে সাথে আপনার ব্যাংক অথবা ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিকে তা জানান। যদি তথ্যটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার পাসওয়ার্ড হয় তাহলে যত দ্রুত সম্ভব পাসওয়ার্ডটি বদলে ফেলুন।

 

পরিচয় চুরি

 

আমরা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করি বিনোদন, কেনাকাটা অথবা সামাজিক যোগাযোগের জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্যের পরিচয় চুরি করার জন্য।

 

কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে আপনি বেঁচে যেতে পারেন এসব চোরের হাত থেকে।

 

আপনার পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য সম্বলিত কাগজ, যেমন ব্যাংকের রিসিট বা এ রকম কিছু ফেলে দেওয়ার আগে চেষ্টা করুন কয়েক টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে যাতে তা কারও হাতে পড়লেও আপনি বিপদে না পড়েন। আর হ্যাঁ, এ রকম মানুষ আছে যারা আপনার ফেলে দেওয়া ময়লা ঘেঁটে আপনার পরিচয় চুরি করার চেষ্টা করবে। ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানে হয় না। মনে রাখবেন আপনি যখন স্মার্ট টিভি দেখছেন, সে সময় স্মার্ট টিভিও আপনাকে দেখছে। এ কারণেই একে ‘স্মার্ট’ বলা হয়।

 

অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করা বা কোনো সাইটে ‘সাইন আপ’ করার আগে তাদের নীতি এবং শর্তগুলো ভালোভাবে পড়ে নিন। যদি আপনার মনে হয় তাদের আপনার ব্যাপারে এসব তথ্য জানার প্রয়োজন নেই তাহলে সাইন আপ করবেন না অথবা নিজের জন্য একটি বানানো নাম ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন।

 

ফিশিং স্ক্যামের দিকে খেয়াল রাখুন। যদি আপনার ব্যাংক থেকে ইমেইলের মাধ্যমে কোনো লেনদেন না করে নিজে টাইপ করে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ঢুকে লেনদেন করুন। আপনার তথ্য দেওয়ার আগে আপনার ব্রাউজারে একটি তালার ছবিযুক্ত আইকন আছে কিনা খেয়াল করুন। এ আইকনটির মাধ্যমে বোঝানো হয় যে আপনার সংযোগটি নিরাপদ। কিন্তু এই আইকন থাকলেই যে আপনার তথ্য অন্য কারও হাতে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে আইকনটি না থাকলে আপনার সংযোগটি নিরাপদ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আপনার ব্যাংক একাউন্ট নিরাপদ আছে কিনা জানতে মাঝে মাঝেই আপনার একাউন্ট এবং ক্রেডিট/ডেবিট কার্ডের খোঁজ নিন। যদি মনে হয় কোনোভাবে আপনি পরিচয় চুরির ভুক্তভোগী হচ্ছেন তাহলে সাথে সাথে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন, পুলিশকে জানান এবং আপনার সংশ্লিষ্ট একাউন্ট বন্ধ করে দিন।

 

উপযুক্ত পাসওয়ার্ড

 

আপনার পাসওয়ার্ডটি হচ্ছে অনেকটা আপনার ঘরের তালার মতো। তালা দুর্বল হলে তা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে যাওয়া যেমন সহজ, পাসওয়ার্ড দুর্বল হলে তা ভেঙ্গে আপনার প্রোফাইলে ঢুকে পড়াও সহজ। আর একবার ঢুকে পড়তে পারলে আপনার ক্ষতি করা কঠিন কিছু নয়। আপনার ব্যক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সব তথ্যই তখন অন্য কারও হাতে চলে যাবে।

 

তাই কঠিন এবং সহজে অনুমান করা যায় না এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

 

অনেকেই পাসওয়ার্ড ভুলে যাবার ভয়ে মোবাইলে অথবা খাতায় লিখে রাখুন। এটা মোটেই ভালো অভ্যাস নয়। যদি নিতান্তই লিখে রাখতে হয় তবে এমনভাবে লিখে রাখুন যাতে আপনি ছাড়া আর কেউ বুঝতে না পারে যে এটা আপনার পাসওয়ার্ড। তবুও ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে পাসওয়ার্ডটি মনে রাখার চেষ্টা করাই ভালো। আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল সম্পূর্ণভাবে আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই কাউকে আপনার পাসওয়ার্ড দেবেন না।

 

নিরাপত্তাসংক্রান্ত সেটিংস

 

প্রায় সব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোই গ্রাহকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। আপনাকে কেউ বিরক্ত করলে তাকে ব্লক করা এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সুযোগ সব মাধ্যমেই আছে।

 

কেউ যদি কোনোভাবে আপনাকে বিরক্ত করে অথবা আপনি যদি কোনো কারণে তার সাথে যোগাযোগে আগ্রহী না থাকেন আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাকে আপনার প্রোফাইল থেকে ব্লক করে রাখার।

 

কোনো নতুন মাধ্যম ব্যবহার করতে গেলে শুরুতেই এসব সেটিংসগুলো জেনে নিন। যদি কোনো কারণে নিজে খুঁজে না পান তাহলে কোনো কাছের মানুষ অথবা গুগলের সাহায্য নিয়ে শুরুতেই আপনার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করে ফেলুন। আর এই সেটিংসের আওতায় শুধু ব্লক/রিপোর্ট না, আরও অনেক কিছু আছে। আপনার পোস্টগুলো কে দেখতে পারবে বা কে পারবে না, আপনার প্রোফাইলের কোন তথ্যটি আপনি সবাইকে জানার সুযোগ দিতে চান না – এ সবকিছুই আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। একটু সময় নিয়ে এগুলো ঠিকঠাক করে নিন। অপরিচিত কারও সাথে অপ্রয়োজনে অনলাইনে যোগাযোগ না করাই ভালো।

 

ম্যালওয়্যার

 

আরেকটি বিষয় যা সম্পর্কে সবারই ধারণা থাকা উচিত তা হচ্ছে ম্যালিসিয়াস সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার। কিছু ওয়েবসাইটে ঢুকলে আমাদের অজান্তেই এসব ম্যালওয়্যার আমাদের কম্পিউটার/ফোনে জায়গা করে নেয়। কখনো কখনো কিছু ভালো ওয়েবসাইট থেকেও ম্যালওয়্যার আসতে পারে। তবে সাধারণত আপনার কম্পিউটারে কিছু খারাপ ওয়েবসাইট, যেগুলো তৈরিই হয়েছে ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, সেসব থেকেই আক্রমণ হয়।

 

আবার কখনো কখনো দেখে আসল মনে হয় এমন ফাইল ডাউনলোড করার সাথে সাথেও ম্যালওয়্যার আপনার কম্পিউটারে চলে আসতে পারে।

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ম্যালওয়্যার চলে আসলে সমস্যাটা কোথায়?

 

আমরা অনেকেই জানি না ম্যালওয়্যার আসলে কতটা ভয়ংকর হতে পারে। আপনার কম্পিউটার থেকে তথ্য মুছে ফেলা এর সবচেয়ে কম ভয়ংকর সম্ভাবনা। ম্যালওয়্যারের সাহায্যে অন্যের ক্রেডিট কার্ড বা পাসওয়ার্ড চুরি করা, আক্রান্ত কম্পিউটার থেকে অন্যদের স্প্যাম ইমেইল পাঠানো এমনকি অন্য কম্পিউটার বা নেটওয়ার্ককে আক্রমণ করার নজিরও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কোনো অপরাধ না করেও শুধু ম্যালওয়্যারের আক্রমণকে প্রশ্রয় দিয়ে আপনি হয়ে যেতে পারেন অপরাধী।

 

আপনার ব্রাউজার যদি আপনি না চাইলেও আপনাকে কোনো ওয়েবসাইটে নিয়ে যায় তাহলে হয়তো আপনার কম্পিউটার বা ফোনে ম্যালওয়্যারের আক্রমণ হয়েছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে কিছু নিয়ম মেনে চলা ভালো।

 

আপনার অপারেটিং সিস্টেম এবং সব অ্যাপ নতুন ভার্সন আসার সাথে সাথে আপগ্রেড করুন। অপরিচিত কোনো লিংকে ঢোকা অথবা ভরসাযোগ্য নয় এমন ওয়েবসাইট থেকে কোনো কিছু ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকুন। কারো পাঠানো লিংকে ঢোকার আগে ভেবে নিন যে পাঠিয়েছে তাকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। অনেক সময় ফেসবুকে আপনার কোনো বন্ধুর আইডি হ্যাক হলে তা থেকে আপনাকেও স্প্যাম লিংক পাঠানো হতে পারে। লিংকে ঢুকার আগে তার আচরণ লক্ষ্য করুন এবং নিশ্চিত হয়ে নিন যে এমন কিছু ঘটেছে কিনা। এবং অবশ্যই একটি ভালো এন্টি-ভাইরাস ব্যবহার করুন ও নিয়মিত আপডেট করুন। এসব সফটওয়্যারের সাহায্যে শুধু ম্যালওয়্যার ঢোকা বন্ধই করা যায় না, নিজের কম্পিউটার থেকে খুঁজে বের করে মুছেও ফেলা যায়। তাছাড়া আপনার ব্রাউজারের জন্য একটি অ্যাড ব্লকার বা ম্যালওয়্যার ব্লকারও অনেকটা সাহায্য করবে।

 

ইন্টারনেটেই হোক আর বাস্তব জীবনেই হোক, সতর্কতার অভাব বিপদ ডেকে আনতে পারে যে কোনো সময়। নিজের নিরাপত্তার দিকে একটু মনোযোগ দিলেই হয়তো এসব বিপদ থেকে বেঁচে থাকা যায়। বিপদে পড়ার পরে না ভেবে, কাজ করার আগে ভাবুন এবং নিরাপদ জীবন কাটান।

Muhsina Zaman Khan Protity

আমি একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ। স্বপ্ন দেখতে আমি খুব ভালোবাসি। আর ভালোবাসি নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করতে। সবসময় চেষ্টা করি আমার আশেপাশের মানুষদের খুশি দেখতে। কারো মুখে হাসি ফোটাতে পারলে সেটাই আমার সেরা অনুভূতি।

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter