ব্যস্ত জীবনে মানসিক শক্তি যোগাতে যা প্রয়োজন

আমরা প্রত্যেকেই কম বেশি ব্যস্ত জীবন কাটাই। অধিকাংশ সময় নিজেদের সুখ- দুঃখ, শখ- আহ্লাদ, ভাল লাগা–খারাপ লাগা গুলোর দিকে চোখই পড়ে না। এতে করে একটা সময় গিয়ে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি যা আমাদের কর্মদক্ষতা নষ্ট করে দেয়। হুট করে হাল ছেড়ে দেওয়া, অল্পতেই ভেঙে পড়া কিংবা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার মত এমন আরো অনেক অবাঞ্ছিত প্রভাব পড়ে আমাদের জীবনে। আর যা কিনা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবনে মরণ ব্যাধি হয়ে।

 

তাই আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে হতাশা এড়ানোর  জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস আমাদের মানসিক শক্তি। চল তবে দেখে নেই সহজ কিছু অভ্যাস যা কিনা দৈনন্দিন জীবনে গড়ে তুলতে পারলে মানসিক শক্তি কে বাড়িয়ে সফলতার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে আরো কয়েক গুণে।

 

 

১। প্রতিদিন ৩টি শব্দ লিখো যার জন্য তুমি কৃতজ্ঞ

 

We tend to forget that happiness doesn’t come as a result of getting something we don’t have, but rather of recognizing and appreciating what we do have.
– Frederick Keonig

 

কোন পরীক্ষায় খারাপ হলে নিজেরাই ধরে নেই আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছুই হবে না। জীবনটাই শেষ গোল্ডেন এ প্লাস না পাওয়ার কারণে কিংবা কাউকে সফল হতে দেখলে আমাদের মাথায় আগেই আসে যে, “ইস, ওর ভাগ্যটা কত ভালো। আমার যদি এমন কপাল থাকতো তাহলে আমিও অনেক কিছু করতে পারতাম।” এরপর শুরু হয় আফসোস। আর এভাবে আমরা বিভিন্ন কারণে হতাশ থাকি, বিষণ্ণতায়  থাকি, ক্রোধে ভুগি, স্ট্রেসড থাকি। এ ধরণের নেতিবাচক অনুভূতি থাকে যতই বের হওয়ার চেষ্টা করি ততই এগুলো চিন্তা ভাবনা আমাদের মাথায় চেপে বসে। আর এটা থেকে বের হয়ে আসতে পারি না। আর এসব চিন্তাভাবনায় আফসোসের লিস্টও বড় হতে থাকে। যার ফলে দিন শেষে নিজের লক্ষ্যের  উদ্দেশ্যের কাজ তো দূরে থাক উল্টো আত্মবিশ্বাসের লেভেল ধপাস করে মাটিতে নেমে যায়।

 

এই মহা সমস্যা থেকে বাঁচতে আমাকে একবার একজন ভাইয়া একটা মজার উপদেশ দেয়। তিনি বলেন- প্রতিদিন রাতে আমরা খাতা আর কলম নিয়ে তিনটা এমন জিনিস লিখে রাখবা, যে তিনটা জিনিসের কারণে তুমি তোমার জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ। কথাটি শুনে আমার একটু আলাদাই লেগেছিলো, তাই প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এমন তিনটি জিনিস যার জন্য তুমি কৃতজ্ঞ বোধ করো তা একটা ডায়রিতে লিখে ফেলবে। শুধু ভাবলেই হবে না, কাগজে কলমে লিখতে হবে। এর ফলে যেটা হবে তা হচ্ছে তুমি ঘুমাতে যাওয়ার আগে সেই জিনিসগুলো নিয়ে ভাববে যেগুলো পেয়েছো বলে তুমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করো। এইগুলো যে খুব বিশাল কোনো জীবন রূপান্তরকারি ঘটনা হতে হবে এমন না। যেমন গতকাল আমার এক বন্ধু আমাকে জোড় করে একটা চিত্র প্রদর্শনী দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। প্রথমে আগ্রহ না থাকলেও ওখানে যাওয়ার পর চিত্রগুলোর অর্থ বোঝার পর একটা অন্যরকম মানসিক শান্তি পেয়েছিলাম। তাই গতকাল রাতে আমি চিত্র প্রদর্শনীর কথা লিখেছি। আসলে কি জানো আমরা আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। তাই যখন প্রতিদিন ছোটখাটো থেকে বড়- সকল বিষয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার অভ্যাস গড়ে তুলবে নিজের মাঝে তখন আর হতাশা নামক বস্তুটির জায়গা তোমার মনে জায়গাই পাবে না। শুধু তাই না নেতিবাচক সকল বিষয়ের উপর থেকে তোমার দৃষ্টি ইতিবাচক দিকে ঘুরে যাবে আর যা কিনা তোমাকে নিয়ে যাবে সফলতার উচ্চতায়।

 

২।  বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর

 

সারাদিন এমনিতেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে রয়েছে তার উপর পাশের বাসার আন্টি এসে নানান অযৌক্তিক কথা বলে আরো বিরক্ত করে তুলছে। ভেতরের ডিবেটারটা খুব উসখুস করছে? কিন্তু না। এতে করে যে শুধু তোমার মেজাজই বিগড়াবে তা না, উল্টো বাসার বড়দের কাছে ঝাড়ি খেতে হবে। অচেনা মানুষের সাথে অযৌক্তিক তর্কে লিপ্ত হওয়া বোকামি ছাড়া কিছু না। তাই নিজের মনকে ভালো রাখতে, নিচের পদ্ধতিগুলি প্রয়োগ করে দেখোঃ

 

  • মুখে মুখে তর্ক করবে না

যখন আমরা রেগে থাকি, অধিকাংশ সময় আমরা না ভেবেচিন্তে কথা বলে ফেলি। আর পরবর্তীতে আফসোস করি। মনে রেখো যে একবার যা বলে ফেলবে তা কখনও ফেরত নিতে পারবে না। তাই কিছু বলার আগে কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে তারপর কথা বলো।

 

  • অতি সহজেই প্রতিক্রিয়া দেখানো বন্ধ করো

তোমার প্রিয় ফুটবল টিমকে কেও খারাপ বলছে? রাগে ফোসফোস করতে করতে এক হাট লোকের সামনে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলে বীরের মতন। কিন্তু না হেরে গেলে তুমি কারণ একজন অচেনা লোকের কথায় নিজেকে হাসির পাত্র বানিয়ে ফেলেছ। তাই অর্থহীন প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোন মানে নেই।

 

  • কেটে পড়ো

কোনভাবেই রাগ দমিয়ে রাখতে পারছো না। চুপচাপ জায়গাটা থেকে সরে যাও। এতে করে তোমার নিজেকে শান্ত করার সুযোগ মিলবে, আবার কোনরকম নির্বুদ্ধিতা প্রকাশ করা থেকে রক্ষা মিলবে।

 

৩। নিজের যেকোন সাফল্যকে উদযাপন করো

 

The more you praise and celebrate your life, the more there is in life to celebrate. – Oprah Winfrey

 

 

সাফল্যের পিছনে ছুটছি আমরা প্রতিনিয়ত। সাফল্যের সংজ্ঞা প্রত্যেকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন। কিন্ত মনে রাখতে হবে যে সফলতা সুখের চাবিকাঠি নয়, সুখ সফলতার চাবিকাঠি। আমরা কোনটা ভুল হলো, কোনটা অর্জন করতে পারলাম না সেদিকে নজর দিতে গিয়ে যেটুকু অর্জন করতে পেরেছি সেটাকেও মূল্যায়ন করতে ভুলে যাই। তাই নিজের প্রতিটা ছোট বড় সাফল্যকে উদযাপন করো আজ থেকেই।

 

এতে করে তোমার লক্ষ্য পূরণের প্রেরণা মিলবে। শুধু তাই না তোমার কর্মস্পৃহা বাড়ার সাথে সাথে বুস্ট হবে সেল্ফ কনফিডেন্স। আর সামনে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার কারণ খুঁজে পাবে। তোমার সাফল্যে উৎসাহিত হবে আরো অনেকে। যার কারণে তুমি নিজেকে নিয়ে ভালো বোধ করবে আর সুখে থাকবে।

 

 

৪। বন্ধ করে দাও অন্যের সাথে নিজের তুলনা

 

Image result for compare

 

অন্যের সাফল্যে আমরা সবসময় ঈর্ষান্বিত বোধ করি। সবচেয়ে কাছের বন্ধুও যখন ফার্স্ট প্রাইজ পায়, তার সাফল্য উদযাপন না করে আমাদের মাথায় ঘুরা শুরু করে, “ ও কেন পেলো? আমি কেন পেলাম না? আমার কি কমতি আছে?” কিন্তু না ভুল করছো তুমি! এমন মনোভাবে আমরা  আরো বেশি ডিপ্রেসেড হয়ে পড়ি। আর সেটা সোজা আঘাত করে আমাদের আত্মবিশ্বাসে।

 

তাই আজকে থেকেই বন্ধ করে দাও অন্যের সাথে নিজের তুলনা। নিজের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়াও। চেষ্টা করো নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে। তার জন্য কাজ করো আর খুব শীঘ্রই তুমি তার ফলাফল দেখতে পারবে। কারণ তুমি যখন নিজের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে কাজ করবে, তোমার সাফল্য কেও আটকাতে পারবে না।

 

৫। চ্যালেঞ্জ নিয়ে আর নয় ভয়

 

A challenge only becomes an obstacle when you bow to it. ― Ray A. Davis

 

সবসময় তো এই কাজ ও করে এবার আমাকে এটা করতে দিয়েছে? অসম্ভব আমি এটা পারবই না। অনেক ক্ষেত্রে এভাবেই আমরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলি। ভেবে দেখো যদি তুমি নিজের চ্যালেঞ্জগুলোকে তোমার যোগ্যতা বাড়ানোর উপায় হিসাবে দেখো তাতে কি লাভ হবে।

 

প্রথমত তুমি নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারবে যা তোমাকে  পরবর্তীতে সাহায্য করবে। তাছাড়া তোমার নিজের উপর ভরসা বাড়বে। আর তুমি নতুন কিছুর মুখোমুখি হলে সহজেই বিচলিত হয়ে পড়বে না। তোমার পসিটিভ ভাবমূর্তি তোমাকে উৎফুল্ল রাখবে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াবে।

 

৬। পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি

 

অনেকদিন ধরে রুমটা অগোছালো হয়ে আছে। পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করলে বহু দিনের পুরানো নানান রকম জিনিস। সেগুলো নিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়লে। সারাদিন আর কিছুতে মন বসল না। তাহলে কি উপায়?

এটা বৈজ্ঞানিক রিসার্চে প্রমাণিত যে তোমার আশপাশটা যত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে, তোমার মন এবং স্বাস্থ্য তত ভালো থাকবে। তাই আজকেই  শুরু করে দাও জঞ্জাট পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি। অপ্রয়োজনীয় অব্যবহৃত যা আছে, সব তোমার আশপাশ থেকে দূরে সরিয়ে ফেলো। মনে রেখো, “ A clean home is a happy home.”

 

৭। পজিটিভিটি হোক প্রতিদিনের সঙ্গী

 

সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক রিসার্চে প্রমাণিত হয়েছে যে পজিটিভ শব্দ ব্যবহার করা আমাদের ব্রেইনকে প্রভাবিত করে। এমনকি যখন তুমি বেশি বেশি পজিটিভ কথা বলবে, তোমার শুধু যে নিজের প্রতি আস্থা বাড়বে তা না, তোমার আশপাশের মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে এবং সাফল্যে উৎসাহিত  হবে। আমাদের সমাজ থেকে নেগেটিভিটি যত কমে যাবে, কর্ম দক্ষতা তত বাড়বে। একজনের প্রতি আরেকজনের হিংসাও কমে যাবে। আর সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেখবে প্রত্যেকেই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করতে পারবে।

 

৮। কান্না নয় কোনো লজ্জার বিষয়

 

কান্নায় অনন্ত সুখ আছে তাইতো কাঁদতে এত ভালোবাসি॥
—স্বামী বিবেকানান্দ

 

 

 

কান্না যেন কী ভীষণ একটা লজ্জার একটা বিষয়! কেউ কাঁদলে পরে তো তা স্বীকারই করতে চায় না। আর অন্যরা তাই নিয়ে যে কী খেপানোটাই না খেপায়। কান্না, কাঁদুনে, ছিঁচকাঁদুনে—এসব নিয়ে যে কত গল্প-লোককাহিনী-ছড়া প্রচলিত আছে, তারও ইয়ত্তা নেই। হয়ত খুব মুষড়ে পড়েছো, কোনোভাবেই কিছু ঠিকঠাক মত হচ্ছে না, ভয় পাচ্ছ সামনে কি হবে তা নিয়ে- ইচ্ছে করছে সব খারাপ লাগাগুলোকে একসাথে ছুড়ে ফেলে দিতে, তাই না?

 

ডিপ্রেশন কাটাতে মন খুলে কান্না করো। কাঁদলে মন হালকা হয় কারণ কেউ যখন কাঁদে, তখন আশপাশের মানুষ সবাই বুঝতে পারে কোনো কারণে তোমার মন ভালো নেই। হয় মন খারাপ, নয়তো তুমি ভীষণ হতাশ, কিংবা চরম পরিমাণে দ্বিধান্বিত। আর এই যে তোমার কাছের মানুষের কাছে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারলে, এটাই তার মনকে অনেকখানি হালকা করে দেবে। আর যদি একা একাও ঘরের এক কোণে বসে দু’ফোটা চোখের জল ফেলো তাও তোমার ভাল লাগবে কারণ মনের ভেতর আটকে থাকা দমবন্ধ করা অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পেরেছো।

 

৯। ব্যস্ততার মধ্যে একাকীত্ব

 

এজন্য প্রতিদিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে সুনসান পরিবেশে কিছুটা একাকী সময় কাটাও। ভোরবেলা বা রাতে ঘুমানোর আগে একা একা নিজের মত সময় কাটানোর জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। আর এই সময় তুমি একটু চিন্তা করে দেখবে যে তুমি বর্তমানে কি করছো। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো আর সততার সাথে তার উত্তর দাও কারণ এখানে তোমাকে কেউ সঠিক উত্তরের জন্য ফুল মার্কস দিবে না।

 

এই অভ্যাসের জন্য তুমি নিজের শক্তি আর দুর্বলতা বুঝতে পারবে। আর তাহলে তুমি সেগুলাকে ব্যবহার করে সামনে কাজও করতে পারবে। শুধু সেটাই না যখন তুমি শান্ত পরিবেশে সারাদিনে নিজের কার্যকলাপ নিয়ে  ভাববে, পরবর্তীতে একি ভুল করা থেকেও বিরত থাকতে পারবে।

 

তাহলে না হয় আজ থেকেই শুরু করা যাক এই সুন্দর অভ্যাসগুলো কে আয়ত্ত করে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং নিজেকে কর্মদক্ষ করে সুখী সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা।

1 thought on “ব্যস্ত জীবনে মানসিক শক্তি যোগাতে যা প্রয়োজন”

  1. Pingback: মানসিক শক্তি - মন ও শরীর দুটোর জন্যই জরুরী - Spike Story

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *