303 Views

জিসান আর সাকিব (ছদ্মনাম) ছোটবেলার বন্ধু। দুই বন্ধুই পড়ালেখায় বেশ ভালো। কিন্তু সাকিব কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে, জিসান কেমন যেন বদলে গেছে। জিসানের মধ্যে আগের মতো সেই প্রাণোচ্ছলতা নেই, পড়াশুনায় ও ক্লাসে অমনোযোগী, কারো সাথে তেমন একটা কথা বলে চায় না, আস্তে আস্তে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, এমনকি সাকিবকেও এড়িয়ে চলে। কিছুদিন পর হঠাৎ করেই জিসান ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিলো। বেশ টেনশনে পড়ে গেলো সাকিব। জিসানের সাথে দেখা করতে তাদের বাসায় যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সে। বাসায় গিয়ে জিসানের বাবা মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলো, জিসান বিষণ্ণতায় ভুগছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এখন তার চিকিৎসা চলছে। সবচেয়ে কাছের বন্ধুর এমন অবস্থা শুনে বেশ মন খারাপ হল সাকিবের। চিন্তা করতে লাগলো কীভাবে জিসানকে এই বিষণ্ণতার করাল গ্রাস থেকে বের করে আনতে সাহায্য করা যেতে পারে। আমাদের অনেকের সাথেই এমনটা হয়ে থাকে। আমাদের বন্ধু অথবা প্রিয়জন অনেক সময় বিষণ্নতায় কাবু হয়ে থাকে, কিন্তু আমরা বুঝতেই পারি না কিংবা বুঝতে পারলেও তাদেরকে এই পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করার জন্য কীভাবে সহায়তা করতে পারি তা জানি না। তাই আজকে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আপনার বন্ধুকে বিষণ্ণতা থেকে মুক্ত করবেন এবং জীবনকে আবার ভালোবাসতে শিখাবেন। তবে তার আগে চলুন বিষণ্ণতা সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেই-

 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কী?

 

ডিপ্রেশন (Depression) শব্দটির মানে দাঁড়ায় বিষণ্ণতা বা মনমরা। বিষণ্ণতা একটি ইমোশনাল ইলনেস এবং এর ফলে রোগীর মন মেজাজের অবনতি ঘটে। মানসিক রোগের মধ্যে সর্বাধিক কমন রোগ বিষণ্ণতা। এটি এমন এক রোগ যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে উদ্বিগ্নতা। বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে বিভিন্ন মাত্রায়, গভীরতায় ও পরিসরে। বেশিরভাগ সময়ে এটি দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন অর্থহীন এবং দুর্বিষহ করে তুলে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভেঙ্গে পড়েন খুব সহজে এবং অলস, অকর্মঠ, শক্তিহীন ও নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

 

সারা বিশ্বেই ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা এক ভয়াবহ ব্যাধি বলে স্বীকৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই বিষণ্ণতা ব্যাধিতে ভুগছে যা তাদেরকে অক্ষমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও দিন দিন বিষণ্ণতায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিষণ্ণতা যে একটা রোগ- এদেশে সেটাই অনেকে বোঝে না অথবা বুঝলেও তা স্বীকার করতে চায় না।

 

বিষণ্ণতা ৩ ধরণের হয়- হালকা, মধ্যম এবং গুরুতর। এই ধরণগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা আলাদা।

 

প্রায় সব মানুষই হালকা ডিপ্রেশনে ভুগে থাকে। যখন কোন মূল্যবান জিনিস হারিয়ে যায় অথবা প্রিয় মানুষের সাথে ঝগড়া হয় তখন মানুষ হতাশ ও বিমর্ষ হয়। এই ধরণের মানসিক অবস্থা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর জন্য কোন চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন হয়না।

 

মধ্যম মানের বিষণ্ণতা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে। এই সময় ঘুম না হওয়া ও ক্ষুধা কমে যাওয়ার মত লক্ষণগুলোই সাধারণত দেখা যায়। এই ধরণের বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং এর সাহায্য নেয়া যেতে পারে তবে ঔষধের প্রয়োজন হয়না। মধ্যম মানের বিষণ্ণতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে মেজর ডিপ্রেশনে পরিবর্তিত হতে পারে। মেজর ডিপ্রেশনের রোগীরা অকর্মণ্য হয়ে পড়ে, জীবনের প্রতি আশা হারিয়ে ফেলে এবং তার পছন্দের কাজগুলো করতেও আর উৎসাহ খুঁজে পায় না। কাজে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, খাওয়া ও ঘুম একেবারেই কমে যায় নয়তোবা অনেক বেশি খাওয়া শুরু করে এবং দীর্ঘসময় ধরে ঘুমায়। অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। গুরুতর বিষণ্ণতার রোগীদের চিকিৎসার প্রধান অংশ ঔষধ। ঔষধ সেবনের ফলে সে হয়তো ভালো অনুভব করবে কিন্তু সে পুরোপুরি সুস্থ নাও হতে পারে। যত দীর্ঘ সময় যাবৎ ঔষধ গ্রহণ করবে, সে ততো ভালো থাকবে। কিন্তু যেই মুহূর্তেই ঔষধ গ্রহণ বন্ধ করে দিবে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। আর এ কারণেই সাইকো থেরাপির প্রয়োজন হয়।

 

এবার চলুন জেনে নেই, কীভাবে আপনার বন্ধুকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত করবেন এবং জীবনকে আবার ভালোবাসতে শিখাবেন।

 

হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন

 

বিষণ্ণতাক্রান্ত ব্যক্তি সবক্ষেত্রেই নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন। তিনি মনে করেন কারো জীবনে তার কোনো গুরুত্ব নেই, কেউ তাকে ভালোবাসে না, কেউই পছন্দ করে না। কেবল চারপাশের মানুষগুলোকেই সফল এবং কর্মঠ মনে করেন আর নিজেকে কোনো কাজের জন্যই ভালো মনে করেন না। এবং আস্তে আস্তে নিজেকে অকর্মণ্য ভাবা শুরু করেন। তাই প্রথমে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করুন তিনি ব্যর্থ কিংবা অকর্মণ্য নন। এবং আপনার কাছে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তার উপস্থিতি আপনার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে এসব নিয়ে আলোচনা করুন। বিষণ্ণতাক্রান্ত বন্ধুকে সবকিছু যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে এবং আশাহত হতে দেয়া যাবে না কোনোভাবেই। এককথায় তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

 

পছন্দের কাজে উৎসাহিত করুন

 

সবকিছুতেই অনাগ্রহ বিষণ্ণতা আক্রান্ত রোগের আরেকটি লক্ষণ। রোগীর আগ্রহের বিষয়ের প্রতিও তখন অনাগ্রহ তৈরি হয়। সে শখের কাজগুলিতেও ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কোন কাজেই উৎসাহ থাকে না। সারাদিন শুয়ে বসে থাকাকেই মনে হয় সব থেকে সহজ কাজ এবং এর বাইরের সকল কাজকেই বোঝা মনে হবে। একসময় যে কাজে রোগী খুব আনন্দ পেতেন, ডিপ্রেসশড হয়ে যাবার পর সে কাজে কোন আগ্রহই পাবে না। তাই তিনি আগে যে কাজটি করতে পছন্দ করতেন তাকে আবার সেসব কাজ করার জন্য উৎসাহিত করুন। তিনি যেসব জায়গায় যেতে পছন্দ করতেন, সেখানে সব বন্ধুরা মিলে পিকনিকের আয়োজন করতে পারেন। অথবা তিনি যদি গান গাইতে পছন্দ করেন তাহলে সবাই মিলে গানের আসরের আয়োজনও করতে পারেন।

 

ইতিবাচক মনোভাব

 

বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইতিবাচক মানসিকতার। কঠিন পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র ইতিবাচক মনোভাবই পারে জীবনকে পাল্টে দিতে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক মনোভাব যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবেলার চাবিকাঠি।

 

কিন্তু ডিপ্রেশনে থাকলে মানুষের মনে নেতিবাচক চিন্তা সবসময় ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি বুঝি সবচেয়ে খারাপ, আমার মত দুঃখ কারো নেই, আমি সবার চেয়ে অসুস্থ- এই ধরনের চিন্তাগুলো সুস্থ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। তাই আপনার বিষণ্ণতাক্রান্ত বন্ধু আপনার সাথে যখন কোন বিষয়ে নেতিবাচক কথা বলবে তখন আপনার কিছু ইতিবাচক কথাই পারে তাকে সাহস ও শক্তি জোগাতে। তার সামনে সবসময় ইতিবাচক কথা বলুন। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখার গুরুত্ব এবং উপকারিতা সম্পর্কে তাকে বুঝিয়ে বলুন।

 

হয়ে উঠুন একজন ভালো শ্রোতা

 

বিষণ্ণতাক্রান্ত ব্যক্তি নিজের মধ্যে অনেক কষ্ট, দুঃখ এবং আবেগ লুকিয়ে রাখেন, কারো কাছে তা প্রকাশ করেন না। আবার মাঝে মাঝে তারা মন প্রাণ দিয়ে চান কেউ তাদের কথা শুনুক, কিন্তু কার সাথে তাদের মনের কথা শেয়ার করবেন তা বুঝে উঠতে পারেন না। তাই বন্ধু হিসেবে আপনার উচিত তাকে আশ্বস্ত করা যে, তার মনের সকল কথা আপনার সাথে তিনি নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারবেন। তার মনের সকল অব্যক্ত অনুভূতি ও কথা প্রকাশ করতে দিন। আপনি শুধু তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে যান। তাকে অযথা উপদেশ এবং পরামর্শ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। তবে তিনি যদি আপনার কাছে কোনো বিষয়ে পরামর্শ চান, সেক্ষেত্রে আপনি তাকে সুপরামর্শ দিতে পারেন।

 

হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন

 

বিষণ্ণতাক্রান্ত বন্ধুকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন। কারণ হাসি বিষণ্ণতা কমায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, হাসি বিষণ্ণতা কমানোর ঔষধ হিসাবে কাজ করে। যারা বেশি হাসেন তাদের বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা কম। আর যারা রসিকতাকে জীবনের সাথে জড়িয়ে ফেলেছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ইতিবাচক যা তাদের বিষণ্ণতার হাত থেকে রক্ষা করে। তাই আপনার বন্ধুকে যদি সুস্থ করে তুলতে চান, তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন। সব বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিন, প্রকৃতির সংস্পর্শে কোথাও ঘুরতে যান, দূরে কোন গ্রামে ঘুরে আসুন। সেইসাথে তাকে হাসিখুশি রাখার জন্য মজার মজার জোকস ও গল্প শুনাতে পারেন কিংবা রম্য গল্পের বইও উপহার দিতে পারেন।

 

পাশে থাকুন

 

বিষণ্ণতাক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় একাকীত্বে ভোগেন। তাই যতটা সম্ভব তাকে সময় দেয়ার চেষ্টা করুন। একসাথে কোনো জিমে ভর্তি হয়ে যেতে পারেন কারণ যেকোনো ধরণের শারীরিক সক্রিয়তা এক ধরণের হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে যা বিষণ্ণতা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আস্তে সহায়তা করবে।

 

এছাড়াও তার সাথে লাইব্রেরি বা পাঠাগারে গিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন অথবা বাসার পাশের পার্কে কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করুন। আপনাকে পাশে পেয়ে আপনার বন্ধুর একাকীত্ব কিছুটা হলেও দূর হবে এবং একঘেয়েমিও কাটবে। শরীর ও মন ঝরঝরে আর স্বতঃস্ফূর্ত হবে।

 

জীবন অনেক মূল্যবান। কিন্তু বিষণ্ণতার কারণে আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের আমাদের প্রিয়জনকে. এই মরণ ফাঁদ থেকে আপনজনদের রক্ষা করতে আমাদের উচিত সচেতন হওয়া, একে অন্যকে সময় দেওয়া, যথাসময়ে সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দেয়া এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

Nabila Chowdhury

Blog Writer - SpikeStory

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter