হাল ছাড়ার অজস্র বাহানা

“স্বপ্নগুলো পাখির ডানায় ভর দিয়ে চায় উড়তে, চায়না কেবল নিজ ডানাটাই গড়তে!”

 

স্বপ্ন নাকি লক্ষ্য? আহা, যা লক্ষ্য  তা-ই কি স্বপ্ন নয়? Usain Bolt যখন বিশ্বের দ্রুততম মানুষ হিসেবে গুনে গুনে আট বার অলিম্পিকে স্বর্ণপদক পেলেন, তখন কি তার পিছনে শুধুই লক্ষ্য কাজ করেছে? স্বপ্ন নয়?

 

সবার জীবনে এমন কিছু স্বপ্ন আছে, যা সত্য করার জন্য প্রয়োজন অক্লান্ত পরিশ্রম আর বিরতিহীন অধ্যবসায়। কিন্তু আসল সমস্যা তো সেই জায়গা থেকেই শুরু। যখনই কথা আসে অক্লান্ত পরিশ্রমের, তখনই মাথাচাড়া দিয়ে জেগে ওঠে অসংখ্য বাহানা। আর ইচ্ছে জাগে কাজ থেকে অবসর নেবার। তখন ‘আর ভালো লাগছে না’ বলে হাল ছেড়ে দিতে চাই আমরা।

 

আর এ হাল ছেড়ে দেয়ার জন্য যে কয়েকটি বাহানা সকলের কন্ঠে ধ্বনিত হয় সেগুলো কিন্তু সবার চিরপরিচিত।

 

তাহলে জেনে নেয়া যাক কি সে বাহানাগুলো?

 

প্রথম বাহানা-

 

আমার দ্বারা এ কাজটি করা মোটেও সম্ভব নয়:

 

‘যা নয় সম্ভব, তা ভয় না পেলেই হয় সম্ভব।’

 

কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়া মানুষেরা নিজেকে প্রতিনিয়ত এটাই বুঝাতে থাকে যে এই কাজ প্রচণ্ড কঠিন। তাই তাদের দ্বারা এ কাজটি সম্পন্ন করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। তারা পারবেনা তো পারবেই না। ফলে তারা হাল ছেড়ে দেয়। যদি হাল ছেড়ে দেয়ার জন্য এ কারণটাই যথেষ্ট হতো তাহলে Dr. Robert Anthony কেনই বা বলেছেন,

 

“You can have anything you want if you are willing to give up the belief that you can’t have it.”

 

সুতরাং অসম্ভব শুধু ততক্ষণ পর্যন্তই অসম্ভব, যতক্ষণ তা অসম্ভব ভাবা হয়। এখনো বুঝি কাজগুলো অসম্ভবই ভাবা হবে?

 

তারপর শুরু দ্বিতীয় বাহানা….

 

আমি কি এ কাজ সম্পর্কে কিছু জানি?

 

আচ্ছা যখন আমরা প্রথম স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম তখন কি আমরা পড়তে পারতাম? পারতাম কি বাংলা বা ইংরেজি অক্ষরগুলো কে চিনতে? পারতাম না তো। তাহলে তখন কেন আমরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেইনি? হাজার অজানার ভিড়েও তখন আমরা ঠিকই স্কুলে গিয়েছিলাম। নতুন করে শিখতে  শুরু করেছিলাম সবকিছু।

 

অথচ এখন কিনা এত বড় হয়ে যাওয়ার পরেও নতুন কিছু শুরু করতে আমরা ভয় পাই। বলে বসি, আমরা এ কাজে অজ্ঞ। এ কাজ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু এটা কি একবার ও ভেবে দেখেছি, “The expert of anything, was once a beginner”. অর্থাৎ যারা এখন কোনো কাজে পারদর্শী, তাঁরাও কিন্তু একদিন সে কাজটি নতুন করে শুরু করেছিলেন। তাহলে আমরা কেন পারবো না নতুন করে ঐ কাজটি শিখতে, কেন পারবো না নতুন করে শুরু করতে?

 

আরও বাহানা নিশ্চয়ই আছে….

 

এতো সময় কোথায়?

 

‘আমাকে তো টিউশনি করাতে হয়, কাঁধে সংসারের অনেক দায়িত্ব। পাশাপাশি একাডেমিক পড়াশুনা, চাকরির পড়াশোনা, ঘরের কাজেও তো বাবা-মাকে সাহায্য করতেই হয়। ছোটদের পড়াশুনাও দেখতে হয়। আমার এত সময় কোথায় ভাই?’

 

আচ্ছা, টিভি দেখা হয়নি কত দিন? কতটা দিন কোনো সিনেমা বা নাটক দেখা হয়না? গান শোনাও তো হয়না নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই সময়ের অভাবে Facebook, YouTube, WhatsApp, Instagram, imo, messenger, Snapchat এগুলোও ব্যবহার করা হয়ে ওঠেনি অনেক দিন, তাইনা?

 

কারণ, সময়ের তো বড্ড অভাব।

 

আচ্ছা! তাহলে বন্ধ নেই এসব কিছুই? সবকিছুই চলছে আপন গতিতে? তবুও সময় না থাকার অজুহাতটা এখনো রয়ে গেছে জীবন্ত।

 

তাহলে এখন কি বুঝতে পারছি যে প্রতিদিন কতটা সময় আমরা অপচয় করি শুধু মাত্র সময় নেই বলে?

 

কেননা, এ ‘সময় না থাকা’ সময়টাকেই কাজে লাগানো যাক? YouTube এ ভিডিও দেখতে দেখতেই শিখে ফেলা যাক প্রয়োজনীয় কিছু দক্ষতা বা পড়াশুনা। অথবা chat করতে করতেই হয়  ইংরেজি লেখার চর্চা।

 

নিজের সময়কে কেউ যত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে, ঠিক ততোটাই সফলতা কিন্তু তার প্রাপ্য। সুতরাং মনে রাখতে হবে, “Everyone has the same 24 hours, your success depends on how you use it”. তাহলে এখন সময় বের করে নেয়া যাবে তো?

 

তবুও তো থাকবেই বাহানা….

 

আমি তো এতো মেধাবী নই:

 

‘মেধা, তুমি কার মস্তিষ্কে ঘোরো? তার মস্তিষ্ক কি আমার থেকেও বড়?’

 

নৈব-নৈব-চ। আসলে সত্যটা হল কারো দিনরাত প্রচেষ্টা আর পরিশ্রম যখন তার জ্ঞান বাড়াতে থাকে, যখন সে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্জন করে নেয় দারুণ কিছু তখন তাকেই অন্যরা মেধা বলে প্রচার করতে থাকে।

 

যে সবসময় প্রথম স্থান অধিকার করে, তাকে আমরা মেধাবী বলি। কিন্তু এ স্থান অর্জন করতে তাকে কত রাত জাগা পরিশ্রম করতে হয়েছে তার হিসাব কিন্তু আমরা কেউই রাখি না।

 

সে যেদিন পরিশ্রম করা ছেড়ে দেবে, সেদিন কিন্তু সে আর প্রথম হবে না। এ প্রসঙ্গে বাস্কেটবল কোচ Tim Notke তাঁর খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, “Hard work beats talent when talent doesn’t work hard”. অর্থাৎ যখন মেধাবীরা পরিশ্রম করা ছেড়ে দেয়, তখন পরিশ্রমীরাই মেধাবী হয়ে ওঠে।

 

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, ‘মেধার’ আসল শক্তিই হচ্ছে ‘পরিশ্রম।’

 

আমি তো আগেও চেষ্টা করেছিলাম:

 

সেই ছোট্ট বেলায় আমাদের পড়ানো হয়েছিল, “একবার না পারিলে দেখ শতবার”।

 

কিন্তু তা পড়ার আরও অনেক আগেই আমরা এটা শিখে ফেলেছিলাম। শতবার চেষ্টা করে অর্জন করেছিলাম সফলতা।

 

কিভাবে? চোখের সামনে কোনো ছোট বাচ্চাকে বেড়ে উঠতে দেখলেই পাওয়া যাবে তার উত্তর।

 

দেখা যাবে, যখন হাজার বার চেষ্টা করেও বাচ্চাটা উঠে দাঁড়াতে পারছে না তখনও সে হাল ছাড়ছে না। একটু দাঁড়াতে পারলেই সে সামনের দিকে ছুটে চলার অবিরাম চেষ্টা করছে। হাঁটতে পারার আগেই শুরু হয়ে যায় তার দৌঁড়ানোর উদ্যমী চেষ্টা। বারবার সে হোঁচট খায়, পরে গিয়ে ব্যথা পায়, তবুও হাল ছাড়েনা। চেষ্টা চালিয়েই যায়। অবশেষে সে ঠিকই হাঁটতে শিখে। শিখে দৌঁড়াতেও। কেউ শিখে একটু তাড়াতাড়ি, আর কেউ একটু দেরিতে। কিন্তু শিখে সব শিশুই।

 

তাই আগে যত হাজার বারই চেষ্টা করা হোকনা কেন হাল ছাড়া যাবে না। ছোট বেলায় যেমন দৌঁড়াতে পারার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমরা হাল ছাড়িনি, ঠিক তেমনি এখনো সফল হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়া যাবে না। মনে রাখতে হবে যতবারই চেষ্টা করা হোক না কেন, সফলতার আগমুহূর্ত পর্যন্ত কোনো চেষ্টাই শেষ চেষ্টা নয়।

 

আহা, এখন কি আর সে বয়স আছে?

 

‘বয়সটা তো বাড়ছেই ছাই,

ক্ষান্ত নেই তার কোন।

কাজটা কি আর করা যাবে এখনো?’

 

কোনো কাজে হাল ছাড়ার বাহানায় এখন বয়সটাও ব্যাপক অবদান রাখে।

 

‘আমার তো অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমি কি এ বয়সে সফল হতে পারবো? এ বয়সে এ কাজ শুরু করেও কোনো লাভ নেই। এ বয়সে ঝুঁকি নেয়া ঠিক নয়।’ যারা এসব ভেবে নির্দ্বিধায় হাল ছেড়ে বসে আছেন, তাদের জন্য কিছু কথা

 

Colonel Harland Sander নামটি নিশ্চয়ই সবার জানা তিনি যখন অবসর প্রাপ্ত হন তখন তার বয়স ছিল পঁয়ষট্টি সে বয়সেই তিনি তার cooking skills ব্যবহার করে বানিয়ে ফেলেন fried chicken এর এক অভিনব রেসেপি তা দিয়েই শুরু করে দেন ছোট্ট একটি ব্যবসা যা বর্তমানে এক বৃহৎ ব্যবসায়ের রূপ লাভ করেছে এবং যা এখন সবার কাছে KFC নামে পরিচিত

 

আবার, Laura Ingalls Wilder কিন্তু তাঁর লেখালেখির কাজ শুরু করেন তেতাল্লিশ বছর বয়সে বারবার তাঁর লেখা বই প্রত্যাখ্যান করা হলেও তিনি কোনো বারই হাল ছাড়েননিচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তাঁর লেখনী আরো উন্নত করার জন্যঅবশেষে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তাঁর প্রথম বই “Little house in the big woods” প্রকাশিত হয়এবং ছিয়াত্তর বছর বয়স পর্যন্ত “Little house” বই এর বিভিন্ন series প্রকাশিত হতে থাকে

 

Gladys Burril তাঁর প্রথম ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন ছিয়াশি বছর বয়সেকিন্তু তিনি বিখ্যাত হন বিরানব্বই বছর বয়সে “Honolulu Marathon” সম্পন্ন করার পর, যে জন্য তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় “Guinness world records” এটা তিনি করতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁর বয়সকে তিনি হার মানাতে পেরেছিলেন তাঁর অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে

 

এছাড়াও Donald Fisher, Alan Rickman, J. K. Rowling, Kathryn Joosten, Susan Boyle, Harry Bernstein সহ আরো অনেকেই প্রমাণ করেছেন যে, “Age is not a barrier. It’s a limitation you put on your mind”.

 

তাহলে বয়স যতই বাড়ুক না কেন, নতুন করে শুরু হোক সকল চেষ্টা

 

বাহানাগুলোকে পরাজিত করে জয়ী হয়ে উঠুক ইচ্ছাশক্তিগুলোচেষ্টাগুলো হয়ে উঠুক আরো উদ্যমী হাল না ছাড়ার মানসিকতার কাছে পরাজিত হোক সকল বাধা

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *