2398 Views

কেউ আপনার কথা না শুনলে কি আপনার সাথে সাথে রাগ উঠে যায়? তাকে বুঝিয়ে বলার চেয়ে ধমক দেয়াই কি তখন শ্রেয় মনে হয়?  কিংবা আপনি কি বন্ধুমহলে রগচটা ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত? বা আপনার ছোট ভাই-বোন আপনার সাথে কথা বলতে বা কোনো আবদার জানাতে কি ভয় পায়? 

 

তাহলে এখনই সময় আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার। কারণ এখন আর আপনি রাগের নিয়ন্ত্রক নন, বরং রাগই আপনার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।

 

রাগ একটি মানবীয় অনুভূতি এবং রাগ সবারই ওঠে। কিন্তু সেই রাগের বশবর্তী হয়ে নিজের বা অন্যের ক্ষতি কখনোই কাম্য নয়। অত্যাধিক রাগ আমাদের অন্যান্যদের সাথে সম্পর্ক ও নিজের স্বাস্থ্য উভয়েই প্রভাব ফেলে।

 

তাহলে আসুন জেনে নেই কীভাবে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 

রাগ দমিয়ে রাখবেন না

 

আমাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায় প্রচন্ড রাগ উঠলেও নিজেকে দমিয়ে রাখে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে মনে করিয়ে দেয় ‘আমি ঠিক আছি’; এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এই পদ্ধতি বোধহয় কার্যকর। কাউকে কিছু বললাম না কিংবা কোনো ধরনের বাকবিতন্ডায় জড়ালাম না, ভালোই তো! কিন্তু এ ধারণা ভুল। কারণ রাগ চেপে রেখে আমরা আমাদের ক্রোধের পরিমাণ আরো বাড়াচ্ছি, ক্রোধানুভূতিকে আরো শক্তিশালী করে তুলছি। রাগ চেপে রাখলে সেই রাগের কারণ মনের মধ্যে স্থায়ীভাবে থেকে যায়, তিক্ত অনুভূতি রয়ে যায় সেই ব্যক্তিকে নিয়ে। কিন্তু আমরা যদি রাগ চেপে না রাখি, অপরজনকে জানাই যে তার কোন কাজটি আমাকে ক্রোধান্বিত করছে তাহলে মানসিক শান্তির পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধনও শক্তিশালী হয়। আগ্নেয়গিরি যেমন শান্ত থাকতে থাকতে হঠাৎ একদিন জ্বলে ওঠে, তছনছ করে দেয় সব নগর-বন্দর, ঠিক তেমনি এই চাপা রাগও যেদিন বেরিয়ে আসে, সেদিন ঘটে যায় কোনো অঘটন। আশেপাশে ঘটে যাওয়া এমন অনেক অনাকাঙ্খিত নৃশংসতার পিছনে রয়েছে এই চাপা রাগ, যা যখন বেরিয়ে এসেছে, ঘটেছে প্রলয়।

 

শারীরিকভাবে রাগের প্রকাশ

 

মা-বাবা কিছু একটা বললো যা ভালো লাগলো না, রুমে এসে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিলাম। কিংবা টেবিলে রাখা গ্লাসটা ছুঁড়ে মারলাম। এই ধরণের কাজ আমরা অনেকেই করে থাকি।এমনকি রাগের মাথায় নিজের সাধের মোবাইল ছুঁড়ে মারার নজিরও আছে অনেক। আমরা ধরে নেই এই হঠাৎ বিস্ফোরণ আমাদের রাগের পরিমান কিছুটা হলেও কমাবে। কিন্তু বাস্তবে হয় তার ঠিক উল্টো। এইধরণের রাগের প্রকাশ আমাদের রাগকে আরো বাড়িয়ে তোলে। অনেকের কাছে তাদের এই কাজের যুক্তি হচ্ছে যে ‘কিছু না করলে মাথা ঠান্ডা হয় না’। কিন্তু এমন করলে কি আসলেও মাথা ঠান্ডা হয়? রাগ কমে যায়? উত্তর হচ্ছে “না”। কিন্তু তাও কেনো আমরা এমন করি?  কারণ আমাদের মন বলে এমন করলে রাগ কমে যাবে, অর্থ্যাৎ সম্পুর্ণ বিষয়টি নির্ভর করছে আমাদের মানসিক সিদ্ধান্তের উপর। আমরা নিজেরা যদি মেনে নিতে পারি যে, গ্লাস ছুঁড়ে মারার কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নিজেকে একটু সময় দেবার, শান্ত হবার, তাহলেই দেখা যাবে কিছু না করেই আমরা খুব সুন্দর করে আমাদের রাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবো।

 

মন অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া

 

আমাদের মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজে একসাথে মনোযোগ দিতে পারে। আপনি নিজেই একটু চিন্তা করে দেখুন, অনেক সময় কাজের মধ্যে কারো কোনো ব্যবহার খারাপ লাগলেও আমরা তা পাত্তা দেই না। কেন?  কারণ আমরা অন্য কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের অলস সময়ে যদি কারো সাথে অমত হয় তা কিন্তু বাকবিতন্ডায় পরিণত হতে সময় লাগে না। কেন? কারণ আমাদের মস্তিষ্ক তখন বেকার, তাকে যা দেয়া হবে সে তাতেই তার শক্তি প্রয়োগ করবে। তাই আমরা যদি আমাদের রাগের মুহূর্তে আমাদের চিন্তা অন্যদিকে সরিয়ে নেই, তাহলেই সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ হবে অনেক কম। আমরা সেইক্ষেত্রে কোনো হাসির কথা টেনে আনতে পারি কিংবা অন্য কোনো টপিকে কথা বলতে পারি। অথবা আমরা পারি কিছু সময়ের জন্য সেই তর্ক থেকে সরে যেতে। এতে করে আমরা নিজে এবং অপরজন পরস্পরের যুক্তিগুলো নিয়ে ভাবার সময় পাবো এবং   ফলশ্রুতিতে সমাধান হবে সহজ।

 

সম্ভাব্য সমাধান খোঁজা

 

ছোটবেলায় এক ঈশপের গল্পে পড়েছিলাম যে, দোষত্রুটি অনেকটা আমাদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের মত। অন্যেরটা সবসময় চোখে পড়ে, কিন্তু নিজেরটা না। বাস্তবেও ঠিক তাই। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে রাগে নিজের মাথায় যখন আগুন জ্বলছে তখন অপরজন যাই বলুক না কেন, তা সর্বদা তিক্তই বোধ হবে। কিন্তু আমরা তো আর ছোট বাচ্চা নই যে অন্যের যুক্তি না শুনে, না বুঝে “যত যাই হোক, তালগাছটা আমার” বলে চিৎকার করে যাবো। আমাদের অন্যের বক্তব্যও শুনতে হবে, তার যুক্তিগুলো বুঝার চেষ্টা করতে হবে। সম্পূর্ণভাবে অন্যের উপর দোষ না চাপিয়ে আমাদের নিজের দোষত্রুটির দিকেও নজর দিতে হবে। আমরা কেউই দোষত্রুটির উর্দ্ধে নই। একাধারে অন্যের ভুল না ধরে অন্যকেও আপনার ভুল দেখিয়ে দেয়ার সুযোগ দিন। কারণ এতে লাভ আমাদের নিজেদেরই। খানিকটা কষ্ট হলেও একজন ভালো মানুষ হওয়ার, নিজেকে শুধরানোর প্রথম পদক্ষেপ নিজের ভুল জানা ও তা মেনে নেয়া।  

 

‌বিষয়টি অন্যভাবে দেখা

 

ধরুন, আপনার সাথে কারো তীব্র তর্কাতর্কি হচ্ছে। সে একটি কথা বলছে তো সাথে সাথে আপনি পাল্টা আরেকটি। ঠিক এই মুহুর্তে কেউ যদি এসে আপনাকে বলে যে গতকাল তার মায়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে, তাহলে কি আপনি চুপ করে যাবেন?  তখন কি আপনি শানতভাবে কথা বলার চেষ্টা করবেন? মেজাজ ঠান্ডা রেখে যুক্তি দিয়ে আপনি তর্কটি জিততে চাইবেন? উত্তর যদি হয় হ্যাঁ, তাহলে একটু ভাবুন। আপনাদের তর্কের বিষয়ের কি পরিবর্তন হয়েছে? -না। উনি কি আপনার কথাগুলো মেনে নিয়েছেন? -না।  উনি রাগের মাথায় যা বলেছেন তা কি উনি ফিরিয়ে নিয়েছেন? – না। কিন্তু তারপরেও আপনি শান্তভাবে এগুতে চাচ্ছেন, রাগহীনভাবে কথা বলতে চাচ্ছেন? কেন! কারণ আপনি আপনার রাগের কারণের উর্দ্ধে ভাবতে পারছেন। অধিকাংশক্ষেত্রেই আমরা একজনের রাগ অন্যের উপর ঝেড়ে থাকি। বাবা অফিসের রাগ মার উপর ঝাড়লো, মা সেটা সন্তানের উপর, সন্তান স্কুলে গিয়ে ঝগড়া করে বসলো তার বন্ধুর সাথে, এগুলো কিন্তু নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা।আর তাই আমরা যদি একটু অন্যের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি রেখে ভাবতে শিখি, তাহলে রাগের বিস্ফোরন তো অবশ্যই, রাগ নিয়ন্ত্রণও অনেক সহজ হয়ে যাবে।

 

শারীরিক কসরত

 

হয়ত আপনি হেডিং পড়ে হেসেই ফেললেন যে এটা কেমন কথা! আমি কি ঝগড়ার মধ্যে জগিং কিংবা লাফানো শুরু করবো নাকি? উত্তর ‘না’। শারীরিক কসরত বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। শারীরিক সুস্থতার জন্য অনেক ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর কসরত যা অন্যের দৃষ্টিগোচরও হয় না এমন কসরতও আছে। কারো সাথে তর্ক শুরু হয়ে গেলে কিংবা কারো কোনো কাজে ক্রোধান্বিত বোধ করলে জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। তিনবার জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস ত্যাগ আমাদের মস্তিষ্কের অক্সিজেন পরিমাণ বাড়ায়, যা আমাদের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ তথা রাগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া কোনো কারণে রাগ উঠার মুহূর্তে আপনি যখন বুঝতে পারবেন তখন আপনি গান শুনতে পারেন, একশ থেকে এক পর্যন্ত গুণতে পারেন কিংবা চোখ বন্ধ করে কোনো সুখ স্মৃতি মনে করতে পারেন। দৈনিক সকালে কিংবা বিকালের জগিং, হাঁটার অভ্যাস অথবা ইয়োগা বা মেডিটেশন আমাদের রাগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

 

‌প্রয়োজনে সাহায্যের দ্বারস্থ হওয়া

 

অনেকক্ষেত্রেই উপরের সকল প্রচেষ্টার ফল হয়ে থাকে শূণ্য। দেখা যায় দিন দিন রাগের পরিমাণ বেড়েই চলেছে আর নিয়ন্ত্রণ কমছে। এতে করে যেকোনো সময়ে হয়ে যেতে পারে বিভিন্ন দূর্ঘটনা কিংবা অনাকাঙ্খিত ঘটনা। অনিয়ন্ত্রিত রাগ থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাসবাদ এমনকি খুনের মত বীভৎস ঘটনার জন্ম। তাই সচেতন হতে হবে আমাদেরকেই। নিজেকে প্রথমে স্বীকার করে নিতে হবে যে হ্যাঁ, আমার রাগ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নিজেকে খুঁজে বের করতে হবে কোন কোন কাজ আমাদের ক্রোধের কারণ। পরিবার পরিজন বা বন্ধুমহলের কাছের কারো সাথে খোলামেলা আলাপ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শও গ্রহণ করা উচিত। ডাক্তারের পরামর্শমত বিভিন্ন থেরাপি এক্ষেত্রে দারুণ সহায়ক। তাছাড়া মেডিটেশনও এক্ষেত্রে উপকারী ফল দেখায়।

 

আপনাকে আপনার কাছের কেউ ভয় পাক, তা নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন না? আপনার রাগের কারনে আপনাকে কেউ এড়িয়ে চলুক তা নিশ্চয়ই কাম্য নয়? রাগের মাথায় নিজের কাজেই ভুল হোক তা নিশ্চয়ই আপনি আশা করেন না? সেক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে আপনাকেই। রাগ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু তা যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখনই তা ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়। সেই ক্ষতির প্রভাব দেখা যায় ঘনিষ্ঠদের সাথে সম্পর্কেও নিজের কর্মক্ষেত্রেও। তাই আর অবহেলা নয়। রাগ নিয়ন্ত্রণে এখনই হোন সচেষ্ট,  নিজের জীবনকে গড়ে তুলুন সকলের শুভকামনা ও ভালোবাসায়।

Sanghita

A sleepy girl with loads of dreams. A Bangladesh girl with opinions! A seemingly headstrong girl with a belief that everyone and everything has a good side whether we see it or not.

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter