পাঁচটি ধাপে অতিরিক্ত চিন্তা থেকে মুক্তি পাবে

A person who thinks all the time has nothing to think about except thoughts.-Alan Watts

 

আপনি কি অতিরিক্ত চিন্তা করেন? আপনি কি সবকিছুর মধ্যেই কোনো বিশেষ অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন? রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ আপনার দিকে তাকালে আপনি কি বাকি পথ তার তাকিয়ে থাকার কারণ ভেবেই পার করে দেন? অথবা অফিসে কোনো সহকর্মী আপনার কোনো কাজ নিয়ে মজা করলে বাকিটা দিন সেটা নিয়েই ভাবতে থাকেন? আপনার কি যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে অনেকটা সময় লেগে যায়? কখন কী কাজ করবেন তা ভেবে উঠতে পারেন না? কাজ করতে করতে প্রায়ই চিন্তার জগতে হারিয়ে যান?

 

যদি এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে আপনি প্রায় সবকিছু নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা করছেন, যা আপনার মানসিক অবস্থার জন্য খুব একটা ভালো নয়। কারণ অতিরিক্ত চিন্তা করার অভ্যাস ধীরে ধীরে আপনার মানসিক শান্তি কেড়ে নেবে। কোনো সাধারণ ব্যাপার নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার পর আমাদের মধ্যে কাজ করতে পারে অপরাধবোধ। আর সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন অতিরিক্ত চিন্তা করে আমরা আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করি।

 

ধরুন, আপনি কোনো কাজ করছেন। কিন্তু কাজটা করার সময় আপনি অনবরত কাজটা কেমন হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে কি না, মানুষ এটা দেখে কী বলবে এসব ভেবে যাচ্ছেন। অনেক চিন্তা, অনেক রকম ভয় আপনার মাথায় কাজ করতে থাকে যা আপনার মনের অনেকটাই দখল করে ফেলে। আর সে কারণেই আপনি আপনার কাজটি হয়তো ঠিকভাবে করতে পারেন না, কাজে মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। কাজের ফলাফল হয়তো আশানুরূপ হয় না। এবং ধীরে ধীরে এই অভ্যাস আপনাকে বিষণ্ণতার দিকে নিয়ে যায়।

 

কিন্তু মাত্র পাঁচটি ধাপ ঠিকমত পালন করতে পারলে আমরা রক্ষা পেতে পারি এই বদভ্যাস থেকে। চলুন জেনে নেই সেই ধাপগুলো কী!

 

প্রথম ধাপ: নিজের চিন্তাগুলোকে বোঝা

 

আপনি কি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন? আপনি কি নেতিবাচক চিন্তা করছেন? শুরুতেই আপনাকে আপনার চিন্তার ধারাটা বুঝতে হবে।

 

আপনি হয়তো ভাবছেন এ আর এমন কী! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা অনেক সময়ই মনের অজান্তে অনেক নেতিবাচক চিন্তায় ডুবে যাই যা আমরা পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ধরতেও পারি না। তাই একটু সময় নিয়ে নিজের চিন্তাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করুন। নিরপেক্ষভাবে আপনার মাথার ভেতরের জগতটাকে বোঝার চেষ্টা করুন। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া অপরিচিত মানুষদের যেমন নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, ঠিক তেমনভাবে আপনার চিন্তাগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করুন। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার চিন্তাগুলো ইতিবাচক না নেতিবাচক। ‘সবকিছু ঠিক আছে’ এই অভিনয় না করে বাস্তবটা মেনে নিন। কারণ নিজের সমস্যাগুলো মেনে নেওয়াই ব্যক্তিত্ত্বের উন্নয়নের প্রথম ধাপ। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হবেন, ততক্ষণ আপনি কোনো কিছুই পাল্টাতে পারবেন না।

 

Choose your thoughts carefully. Keep what brings you peace, release what brings you suffering. And know that happiness is just a thought away.

 

দ্বিতীয় ধাপ: চিন্তার ডায়েরি

 

আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিদিন প্রায় ৭০,০০০ চিন্তা তৈরি করে। এতগুলো চিন্তা মনে রাখা নিশ্চয়ই কারও পক্ষে সম্ভব না। তাই আপনার চিন্তার প্রক্রিয়া আরো ভালোভাবে বুঝতে একটি ডায়েরি তৈরি করুন যেখানে আপনার প্রতিদিনের ভাবনাগুলো লিখে রাখতে পারবেন।

 

Concentrate all your thoughts upon the work at hand. The sun’s rays do not burn until brought to a focus. -Alexander Graham Bell

 

চেষ্টা করুন মনে উদয় হওয়ার সাথে সাথেই চিন্তাগুলো লিখে ফেলতে। অবশ্যই প্রত্যেকটা ক্ষুদ্র বিষয় লিখে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু অন্তত যেগুলো আপনাকে বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সেগুলো লেখার চেষ্টা করুন। হয়তো এর মাঝে অনেক নেতিবাচক চিন্তা থাকবে। কিন্তু এই ডায়েরিটা আপনাকে আপনার মাথার ভেতর কী চলছে তার একটা পরিষ্কার ধারণা দেবে। এবং তার ফলে আপনি যে পরিবর্তন গুলো আনতে চান, তা অনেক সহজ হয়ে আসবে।

 

তৃতীয় ধাপ: মেডিটেশন

 

মেডিটেশন, যাকে আমরা বাংলায় বলি যোগব্যায়াম, আপনার শরীর এবং মন দুটোর জন্যই খুব ভালো। মেডিটেশন নিঃসন্দেহে আপনার চিন্তা ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে তুলতে সাহায্য করবে।

অতিরিক্ত চিন্তা করা বন্ধ করার জন্য আপনার নিজের মনকে অনেকটা প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলা যায়। আপনার নিজের মনকে শেখাতে হবে তার কী ভাবা উচিত, কতটা ভাবা উচিত। নিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে হবে আপনার চিন্তার ওপর। যখন আপনি মেডিটেশন করবেন, আপনার নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগটা থাকতে হবে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর। শুরুতে হয়তো এটা তেমন সহজ হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে আপনি আপনার মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে যাবেন। আপনার মস্তিষ্ক খুব সূক্ষ্ম বিষয়ের দিকেও পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া শিখবে। এবং যখন আপনি যে কোনো বিষয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেবেন, অতিরিক্ত কোনো চিন্তা আপনার মনে ঠাঁই করে নিতে পারবে না। আপনার চিন্তাকে আপনার জীবন নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেবেন না। বরং আপনি আপনার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখুন। তাহলেই আপনি আপনার উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে পারবেন।

 

চতুর্থ ধাপ: কাজের প্রতি মনোযোগ

 

আপনার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আরেকটা উপায় হলো নিজের প্রতিদিনের কাজগুলোর ওপর পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া এবং আপনার মাথার ভেতর চলতে থাকা চিন্তাগুলোকে আপনার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া।

 

যখন যে কাজটা করছেন, সেই কাজটার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে যান। অন্য কোনো চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। যদি কোনো চিন্তা করতেই হয় তাহলে কাজ শুরু করার আগে করুন। যে কোনো কাজ করার আগে তার একটি পরিকল্পনা তৈরি করে নিন। কী কী করবেন, কীভাবে করবেন, কত সময়ে করবেন সব একটি কাগজে লিখে ফেলুন। যাতে কাজ করার সময় আর কিছু ভাবতে না হয়। পুরোপুরিভাবে কাজে মনোযোগ দেওয়া যায়। কাজটা যখন করা হচ্ছে তখন সবটা মনোযোগ শুধুমাত্র কাজ করার ওপর দিন। পৃথিবীতে আর কোনো কিছুই নেই আপনার কাজটা ছাড়া এরকম একটা মানসিকতা নিয়ে কাজ শুরু করুন।

 

রাস্তায় হাঁটার সময় চিন্তার জগতে হারিয়ে না গিয়ে আপনার আশেপাশের পরিবেশের দিকে মনোযোগ দিন। টিভি বা কোনো ভিডিও দেখার মত সহজ কাজগুলো করার সময় মনোযোগ অন্যদিকে চলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। নিজের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করুন এবং সবটা মনযোগ দিয়ে ভিডিওটা দেখুন। প্রতিদিনের কাজের পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন যা আপনাকে মানসিকভাবে ব্যস্ত রাখবে, যেমন গাড়ি চালানো অথবা ট্রেকিং, যেখানে আপনি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে বাধ্য। আপনার মস্তিষ্ককে আপনার বাস্তব সময়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে বাধ্য করুন।

 

মোট কথা নিজের মস্তিষ্ককে সবসময় ব্যস্ত রাখুন। আপনার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিতে এই অভ্যাসগুলো কাজে দেবে। দিনের পর দিন এভাবে চর্চা করতে থাকলে একদিন দেখবেন এটা আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

 

পঞ্চম ধাপ: নিয়ন্ত্রণ

 

আরেকটা উপায় হচ্ছে নিজের অপ্রয়োজনীয় চিন্তা গুলোকে আপনার ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা শিখুন। এটা আসলে আপনার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দেওয়ারই একটি অংশ। যখনই আপনার মাথার ভেতর একটা কণ্ঠ আপনার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে তখন নিজেকে বোঝান যে এটা শুধুমাত্র একটা কণ্ঠ যাকে আপনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন। আপনি চাইলেই সেই কণ্ঠটাকে দিয়ে যে কোনো কিছু বলাতে পারেন। আর এটা যদি রপ্ত হয়ে যায় তাহলে আপনি আপনার মনের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবেন।

 

চিন্তার প্রতিফলন ঘটে স্বভাব বা প্রকৃতিতে যদি কেউ মন্দ অভিপ্রায় নিয়ে কথা বলে বা কাজ করে দুঃখ তাকে অনুগমন করে আর কেউ যদি সুচিন্তা নিয়ে কথা বলে বা কাজ করে সুখ তাকে ছায়ার মত অনুসরন করে -গৌতম বুদ্ধ

 

আপনি চাইলেই আপনার মাথার ভেতরের সেই কণ্ঠটাকে নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে, নিজের উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে ব্যবহার করতে পারবেন। আর যদি না পারেন তাহলে আপনার জীবন আপনার ইচ্ছামতো চলার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই নিজের চিন্তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা খুবই জরুরি। এবং এ কারণেই নিজের চিন্তাকে বোঝা এই পদ্ধতির প্রথম ধাপ ছিল।

 

যখনই আপনি আপনার মনের ভেতর কোনো নেতিবাচক চিন্তার উপস্থিতি টের পাবেন, তখনই ভাবুন কীভাবে এই চিন্তাটাকে ভালো কিছুর দিকে ঘোরানো যায়? কীভাবে এই চিন্তাটাকে আপনার লাভের জন্য ব্যবহার করা যায়? এই ছোট্ট পরিবর্তনটা প্রতিদিন অভ্যাস করলে তা আপনাকে প্রচণ্ড বিষণ্নতার জায়গা থেকে প্রায় কোনোরকম নেতিবাচক চিন্তা না করার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে।

 

আমি বলছি না চিন্তা করা খারাপ কিছু। কিন্তু সেই চিন্তাটাকে আপনার বাস্তব জীবনের ক্ষতি করতে দেবেন না। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত চিন্তা করা, বিশেষ করে যদি তা নেতিবাচক হয়, একটি বদভ্যাস যা আপনার জীবনকে পুরোপুরি অগোছালো করে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *