1337 Views

পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো ‘কমিউনিকেশন’ বা ‘যোগাযোগ’। এদেশের  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কমিউনিকেশন স্কিলে দক্ষতা অর্জনকে ততটা জোর দেয়া হয় না। আপনি কর্মজীবী হোন বা শিক্ষার্থী অন্যদের চেয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে যোগাযোগে দক্ষতা অর্জন আপনার জন্য জরুরী।

 

There is no skill on this Earth that can replace the ability to effectively communicate

 

চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক যোগাযোগের দক্ষতা অর্জনের উপায়গুলো

 

১. মনোযোগ দিয়ে শুনুন

 

খেয়াল করে দেখুন, আমাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা শুধু নিজেরাই কথা বলে যায়, অন্য মানুষ কী বলছে তাতে কিছুই যায় আসে না।  এরকম মানুষকে আপনার কখনোই ভালো লাগবে না  যে শুধু নিজেই বলতে চায়, আপনারটা শুনতে চায় না। আবার এমন অনেকে এখনো আপনার হৃদয়ে জায়গা করে আছে; যারা খুব বেশী কিছু বলেনি কিন্তু মনোযোগের সাথে আপনার প্রতিটা কথা শুনেছে এবং আপনার কথায় সাড়া দিয়েছে। কাউকে ভালোভাবে বুঝতে হলে তার প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনতে হবে, হৃদয় দিয়ে শুনতে হবে। সফল ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।  কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা মানে হলো- তাকে দাম দেয়া, মর্যাদা দেয়া, সম্মান দেখানো। ঠিক তেমনই অন্যের কথা না শোনা মানে তাকে গুরুত্ব না দেয়া, মর্যাদা ও সম্মান না দেখানো। এতে  করে সেই মানুষটি কখনোই আপনার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখবে না। তাই যখনই আপনি কারো সাথে কথা বলবেন তার কথা আগে মনোযোগ দিয়ে শুনুন সে কী বলতে চাইছে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করুন। বক্তার কথা শেষ হয়ে গেলে তবেই প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করুন।  এতে করে খুব সহজেই আপনি তার মন জয় করে নিতে পারবেন।

 

২. ননভার্বাল কমিউনিকেশন

 

সবচেয়ে  ভালো যোগাযোগ মাধ্যম হলো বডি ল্যাংগুয়েজ আপনি একজনের সাথে কথা বলছেন আর সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বা মোবাইল টিপছে। এমন মানুষকে কখনো ভালো লাগবে? অবশ্যই না। সারা পৃথিবীতে রেডিও-এর চেয়ে টিভি অনেক বেশি জনপ্রিয় কিংবা অনেক বেশি ভালো যোগাযোগের মাধ্যম কারণ টিভিতে আপনি বডি ল্যাংগুয়েজ বুঝতে পারছেন। আপনি শতকরা ৬০ ভাগ ইফেক্টিভ কমিউনিকেশন করতে পারেন সামনা-সামনি, নয়তো ভিডিও কমিউনিকেশনে মানুষের শরীরের অঙ্গভঙ্গি অনেক কিছু বলে দেয় যা টেক্সট বা অডিও সেটাকে ধারণ করতে পারে  না মুখোমুখি যোগাযোগ ব্যবস্থায় আপনার গলার স্বর, শরীরের ভাষা সবকিছু চোখ/কান ক্যাপচার করে আপনার ব্রেইনকে দিতে পারে; আপনার ব্রেইন সেগুলো প্রসেস করে আপনাকে যা বোঝায়, আপনি তাই বোঝেন একবার চিন্তা করুন তো- ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ যারা সামনে থেকে ওই ভাষণ শুনেছেন তাদের অনুভূতি, আর আমরা যারা এখন টিভি কিংবা ইন্টারনেটে দেখি তার অনুভূতির পার্থক্য কতটুকু?  সুতরাং যার সাথে কথা বলছেন তার চোখের দিকে তাকাবেন যেন সে বুঝতে পারে আপনি তার কথা মন দিয়ে শুনছেন, ফোকাস করেছেন।

 

৩. আত্নবিশ্বাসের সাথে কথা বলুন

 

ধরুন আপনি একটি প্রেজেন্টেশন দিতে যাবেন টপিক সম্পর্কে আপনার খুব ভালো ধারণা আছে কিন্তু যখনই আপনাকে প্রজেন্টেশন দিতে ডাকা হলো আপনি কিছুই বলতে পারলেন। এমন পরিস্থিতি হলে অন্যদের তুলনায় আপনি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। আপনি যদি আপনার নিজের বক্তব্যের ব্যাপারে অনিশ্চিত থাকেন,  অপরজন সেখানে নিশ্চয়তা খুঁজে পাবে না। তাই নিজের আত্নবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন। যেখানে জোরে কথা বলার দরকার সেখানে জোরে কথা বলুন, যেখানে  আস্তে কথা বলার দরকার সেখানে আস্তে কথা বলুন। স্পষ্টভাবে কথা বলুন যেন যে শুনছে সে যেন বুঝতে পারে আপনি যা বলছেন তাই সঠিক। অপরজনও তাতে প্রভাবিত হবে, ভরসা খুঁজে পাবে।

 

৪. নব্বই সেকেন্ড রুলস

 

আমরা যখন কোন ম্যাগাজিন দেখি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ২ সেকেন্ডেই ঠিক করে ফেলে ম্যাগাজিনটি পড়বো কী পড়বো না। ম্যাগাজিনের কভার আকর্ষণীয় হলেই আমরা সেটা খুলে দেখি। ঠিক তেমনি কোন ব্যক্তি আপনাকে কেমন ভাবে গ্রহণ করবে তা প্রথম দর্শনের নব্বই  সেকেন্ডের মধ্যেই ঠিক করে ফেলে অর্থাৎ তিনি আপনাকে পছন্দ করবে কিনা বা কতটা পছন্দ করবে তা নির্ধারিত হয় মাত্র নব্বই  সেকেন্ডে।  সুতরাং প্রথম নব্বই  সেকেন্ড নব্বই বছরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অঙ্গভঙ্গি, অভিব্যক্তি কন্ঠস্বরের যথার্থ ব্যবহার করুন এই নব্বই  সেকেন্ডে। আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গীতে কথা বলুন চোখে চোখ রেখে আর হরণ করুন সদ্য পরিচিত হওয়া মানুষটার হৃদয়।

 

৫. হাসি

 

সুকুমার রায় লিখে গেছেন, ‘হাসছি মোরা হাসছি দেখো, হাসছি মোরা আহ্লাদী’। কারো মন জয় করতে মোক্ষম অস্ত্র  হাসি। হাসি দিয়ে যেমন কারো মন জয় করা যায় তেমনি কারো রাতের ঘুমও কেড়ে নেয়া যায়।  আর যখন তা প্রথম পরিচয়ের ব্যাপার হয় তখন তো হাসিই ভরসা। একটি চমৎকার স্মিত হাসি হাজার কথার চেয়েও মধুর। তাই কথা বলার সময় একটা অকৃত্রিম হাসি চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলুন। মানুষ অনুকরণপ্রিয়। তাই আপনার হাসি মুখ সামনের মানুষটির মুখেও হাসি ফুটিয়ে তুলবে যা আলাপ করে তুলবে আরো প্রাণবন্ত।

 

৬. আপত্তিকর প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকুন

 

আমরা প্রায় ভুলে যাই আপত্তিকর বা বিব্রতকর প্রশ্ন কোনটা!  যেমন তরুণ বা তরুণী হলে হরহামেশাই জিজ্ঞাসা করে বসি, আপনার বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ড আছে?  বা  আপনার সিজিপিএ কত?   প্রথম পরিচয়ে কেউ এমন প্রশ্ন করলে  প্রায় প্রত্যেকেই বিব্রত হয়। আর যদি কেউ পরিস্থিতি সামলে হাসি মুখে এমন বিব্রতকর প্রশ্নের উত্তর দেয়, তবে জেনে রাখুন সেই উত্তর মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। আবার প্রথম পরিচয়ে আলাপের এক পর্যায়ে কারো সেলারি বা বয়স জানতে চাওয়া আরও বেশি বিব্রতকর। এছাড়া একান্ত ব্যাক্তিগত প্রসঙ্গগুলোও প্রথম পরিচয়ে এড়িয়ে চলা উত্তম। সুতরাং প্রথম পরিচয়ে কখনো আপত্তিকর বা বিব্রতকর কোনো প্রশ্ন নয়, বরং এমন প্রশ্ন করুন যাতে তিনি আলাপ এগিয়ে নিতে উৎসাহ পান।

 

৭. বন্ধুত্বপূর্ন আচরণ করুন

 

বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করা মানুষদের আমরা সবাই খুব পছন্দ করি, তাই না?  একটা বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি,  বন্ধুত্বপূর্ণ টোন বা ভাব অপরজনকে আপনার সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আপনাকে  সৎ করে তুলবে। তারা খোলামেলাভাবে কথা বলায়  উৎসাহ পাবে। একজন সহানুভূতিসম্পন্ন মার্জিত ব্যক্তিকে সকলেই পছন্দ করে। তার সাথে কথা বলা, নিজের ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথা শেয়ার  করা সহজ স্বাচ্ছন্দ্যময়। আপনার সামনে  অন্যকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে দিন, যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে যাবে।

 

৮. সহানুভূতি  প্রদর্শন করুন

 

আপনার অপর পাশের মানুষের সাথে আপনার মতের অমিল থাকতেই পারে।  সকলের সাথেই আপনি একমত হবে এমন কিন্তু না।  সেটা আপনার অধীনে কাজ করা লোকটির ক্ষেত্রেও হতে পারে আবার আপনার বন্ধুর হ্মেত্রেও হতে পারে। কী করবেন তখন?  আপনি চুপ থাকেন বলে তাকে থামিয়ে দিবেন? অবশ্যই না।  তাদের  বোঝার চেষ্টা করুন, সম্মান দেখান। দ্বিমত জানাতে শুরুটা এভাবে করুন– ‘আপনার ব্যপারটা বুঝতে পেরেছি। আপনার জায়গায় থাকলে হয়তো আমিও এভাবেই ভাবতাম বা বলতাম। কিন্তু….’  তাদের জানার সীমাবদ্ধতা বা অন্য কোনো কারণে হতে পারে এটা  কিন্তু দোষের নয়। আপনি ব্যপারটা বোঝার চেষ্টা করে তাকে সম্মান দিয়ে আপনার মতামত প্রকাশ করুন। তবে খেয়াল রাখবেন সে যাতে অপমানিত বা পরাজিত অনুভব না করে।

 

৯. সাড়া দিন

 

আপনি যার সাথে কথা বলছেন তার কথায় সাড়া দিন। সাড়া দিতে পারা,  সঠিকভাবে ফিডব্যাক দেয়া কমিউনিকেশন স্কিলের একটি গুরুত্বপূর্ন জায়গা। ফিডব্যাকেরক্ষেত্রে গঠনমূলক (constructive) থাকা জরুরী। কেউ আপনার সাথে কথা বলেই যাচ্ছে আর আপনি চুপ করে আছেন তাহলে সেই মানুষটি আপনার সাথে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। সামনাসামনি, ফোন বা ইমেইলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন,  যোগাযোগের জবাব দিন। প্রশ্নের জবাব দেয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগেরহ্মেত্রে। আলোচনায় যেখানে প্রয়োজন সেখানে সাড়া দিন, প্রয়োজনে প্রশ্ন করুন, একমত জানান, প্রশংসা করুন।

 

১০. যোগাযোগের  সঠিক মাধ্যম ব্যবহার করুন

 

পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করার বিভিন্ন মাধ্যম  থাকে। এটা জানা খুব জরুরী যে,  যোগাযোগের জন্য কোন ধরনের মাধ্যম বেছে নিতে হবে।  এমন কিছু ব্যপার আছে যা ফোনে বা ইমেইলে বুঝিয়ে বলা যায় না।  এক্ষেত্রে সামনাসামনি বলুন। আবার এমন অনেক ব্যপার আছে যা হয়তো সামান্য একটা টেক্সট ম্যাজেস বা ইমেল দিয়ে করে ফেলাই ভালো। সেক্ষেত্রে সামনাসামনি বসতে গিয়ে নিজের অপরের সময় নষ্ট হতে পারে। তাই যোগাযোগের জন্য কেমন মাধ্যম বেছে নিতে হবে, এটা বোঝা জরুরি। এটা কমিউনিকেশন স্কিলের আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ন জায়গা।

 

আপনার জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকটাই নির্ভর করে আপনার যোগাযোগের দহ্মতার উপর। কমিউনিকেশন স্কিল একদিনেই ইমপ্রুভ করা বা পাল্টে ফেলা যায় না। এটি একটি দীর্ঘতর প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের অভ্যাসই পারে আপনার কমিউনিকেশন দক্ষতা বাড়াতে।

 

আরও পড়ুনঃ দ্রুত কাজ শেষ করার ৮টি কার্যকর উপায়

Shanjana Rahman

Currently studying Sociology at jagannath university .I am a big fan of thriller movies and books . A Believer in Miracles . Never Stop believing .

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter