1595 Views

বর্তমানের ব্যস্ত জীবনে প্রায় প্রতিদিন সকালেই তাড়াহুড়া করে ঘুম থেকে উঠে, দাঁত ব্রাশ করে দৌড়-ঝাঁপ করে বাসে বা রিক্সায় অফিসে বা ভার্সিটিতে যেতে হয়, তাই না? নিজেকে একটু জিজ্ঞাস করুন, প্রতি সকালে এধরনের কাজ করা হাজারো মানুষের মধ্যে আপনি একজন কিনা। এই কারণে অনেক সময় নাস্তা করার সুযোগ হয় না। ফলে দেখা যায় নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা। চীনের পেইচিং নর্মাল ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত পুষ্টিবিজ্ঞানী আন চিয়ান হুয়া বলেন, দীর্ঘকাল ধরে যারা সকালে নাস্তা থেকে দূরে থাকেন, তাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দেবে এবং শরীর মোটা হয়ে যাবে।

তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক কেন আপনার কখনোই সকালের খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়

 

বিপাক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে

 

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যারা সকালের নাস্তা ঠিকমতো করেন তাদের বিপাক ক্ষমতা তাদের চাইতে বেশি যারা সকালের নাস্তা এড়িয়ে যান। সকালের নাস্তা না খাওয়ার ফলে আপনার বিপাক ক্ষমতা বা হজম শক্তি কমে যেতে থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। এতে আপনার পাকস্থলী ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগ, যেমন-  জন্ডিস, অ্যানিমিয়াও হতে পারে।

 

হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়

 

নিয়মিত ১০ মিনিটের সকালের নাস্তা কমিয়ে দিবে আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি। আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলোজির জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা সকালের নাস্তা একেবারেই করেন না তাদের হৃদযন্ত্রের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য সবার থেকে দ্বিগুণ। এই গবেষণায় টানা ছয় বছর ধরে স্পেনের একটি প্রতিষ্ঠানের মাঝবয়সী চার হাজার কর্মীর সকালের নাস্তার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। এছাড়াও গবেষণায় দেখা যায়, যারা তাদের সকালের নাস্তায় প্রতিদিনে শরীরে ক্যালরির চাহিদার ৫ শতাংশের কম পরিমাণ ক্যালরি সম্পন্ন খাবার খায়, তাদের ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ এবং গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।

 

ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা হ্রাস করে

 

নিয়মিত সকালের নাস্তা বাদ পড়ে যাওয়ার কারণে  টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  সাধারণত এই রোগের সম্ভাবনা মহিলাদের মাঝে বেশি লক্ষণীয়। সকালে রান্নাঘরে কাজের চাপে তাদের সকালের নাস্তা করতে দেরি হয়ে যায়, এমনকি বাদও পড়ে যায় অনেক সময়। তাই যত কাজই থাকুক না কেন, অবশ্যই সকালের নাস্তাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিসম্মত খাবার খাওয়া দরকার।

 

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

 

বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। সকালের নাস্তাকে হেলাফেলা করা ঠিক এতোটা ক্ষতিকর হতে পারে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। বিশেষ করে তাদের জন্য যাদের ওজন বেশি এবং ওজন কমানোর জন্য না বুঝেই এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের ডায়েট প্ল্যান করে থাকেন। তাদের মাঝে ডায়েট প্ল্যান নিয়ে একটি ভ্রান্ত ধারণার কারণে দেখায় যায় যে, স্লিম হতে হলে সকালে খাওয়া যাবে না,  সকালের নাস্তা একেবারেই করেন না বা স্বাস্থ্যসম্মত কিছুই খান না। আর এর কারণেই শরীরে জন্মাতে থাকে ক্যান্সারের কোষ। আশা করা যায়, এ বিষয়টি জানার পর সকালের নাস্তার দিকে অবশ্যই বিশেষ নজর দিবেন সবাই!

 

বুদ্ধিদীপ্ত হতে চাইলে সকালের নাস্তাকে ‘হ্যাঁ’ বলুন

 

আমেরিকাতে ৩১৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর উপর একটি গবেষনা করে দেখা যায়, যারা নিয়মিত সকালের নাস্তা করে তাদের বুদ্ধিমত্তা বেশী তাদের তুলনায় যারা সকালের নাস্তা করে না।

কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী বা যারা ছাত্রজীবনে আছেন তাদের সবার মাঝে সকালে নাস্তা না খাওয়ার প্রবণতাটা অন্য সবার চাইতে বেশি থাকে। সকালে কিছু না খেয়েই স্কুল, কলেজে কোনো রকমে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়া করে বেড়িয়ে যেতে  হয়। কিন্তু এতে করে যে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তা হয়তো বা খেয়ালেই নেই তাদের! তার চাইতেও বড় বিষয় হলো সকালের নাস্তা না করাতে মস্তিষ্ক যথাযথভাবে কাজ করে না। কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতাও কমে যায়। তাই পড়া মনে রাখতে ও বুদ্ধির যথাযথ বিকাশের জন্য সকালের নাস্তা করা অবশ্যই খেতে হবে।

 

চুল পড়ার সমস্যা কমায়

 

অনেকেই চুল পড়ার ভয়াবহ সমস্যায় ভোগে। কিন্তু এর জন্য আপনি নিজেই দায়ী। অবাক হচ্ছেন? কথাটা কিন্তু সত্যি। কেরাটিন নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। সকালের নাস্তায় যে প্রোটিন আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন এর কারণেই আপনার নতুন চুল গজানোতে বাঁধা সৃষ্টি হচ্ছে। সকালের নাস্তা আপনার চুলের জন্য উপকারী কারণ এটি চুলের ফলিকল এনে দেয় পরিপূর্ণ পুষ্টি ও শক্তি। যার ফলে চুলের গোঁড়া হয় মজবুত ও শক্ত। তাই নারী-পুরুষ সবারই উচিত সকালের নাস্তায় সঠিক পরিমাণে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। আর অবশ্যই সেটা খেতে হবে সময়মতো। তাই খেয়াল রাখুন, ঘুম থেকে ওঠার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই যেন সকালের নাস্তাটা খাওয়া হয়ে যায়। তাহলে আপনার চুলের ফলিকল ভালো থাকবে এবং নতুন চুল গজানোর সাথে সাথে চুল পড়াও কমে যাবে।

 

ওজন হ্রাস করতে সাহায্য করে

 

অনেকে ওজন বেড়ে গেলে হঠাৎ করে ডায়েটিং শুরু করেন। এক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েরা অনেকখানি এগিয়ে। যারা ওজন কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে থাকেন, তারা যদি সকালের নাস্তা না করে তাহলে খাবার খাওয়ার সময়ে বেশ খানিকটা তারতম্য থাকার কারণে স্বাস্থ্যে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে। বিষয়টি অস্বাভাবিক ও অবাস্তব মনে হলেও সত্যি! দুপুরের ও রাতের খাবার খাওয়ার সময় তাদের শরীরে ফ্যাটি এসিড ও মিষ্টি খাবারের চাহিদা বেড়ে যায়। তাড়াহুড়া করে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সকালের নাস্তা এড়িয়ে যাওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে করে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এর ফলে নির্দিষ্ট ও যথাযথ ডায়েট প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিদিন ক্যালরির চাহিদা সম্পূর্ণরূপে পূরণ না হওয়ার কারণে শরীরে এর প্রভাব পড়ে। তাই ডায়েট প্লান করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

 

কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে

 

মাঝে মাঝে খেয়াল করলেই দেখবেন সারাদিন খিটমিটে মেজাজ ও ক্লান্তবোধ হচ্ছে। যদি সকালের নাস্তা না করে থাকেন তাহলে শরীরের এই অবস্থা নিয়ে একদমই ভাববেন না। কারণ নাস্তা না করার কারণেই আপনার শরীরের এই প্রতিক্রিয়া! যাদের এরকম নাস্তা না করার অভ্যাস রয়েছে তারা প্রতিনিয়তই কাজেরক্ষেত্রে অবসাদ অনুভব করে, খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মেজাজটাও বিগড়ে থাকে।এভাবে সকালে নাস্তা না করার অভ্যাস গড়ে তুললে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যায় এবং এর কর্মশক্তি কমে যেতে থাকে। তাই কাজের গতি বাড়াতে সকালের নাস্তা চাই-ই-চাই।

 

মনোযোগ বৃদ্ধি করা

 

“মন বসে না পড়ার টেবিলে”, “মন বসে না কাজে” এসব বাক্য অনেকের জন্যই প্রায়ই ভয়ংকরভাবে সত্যি হয়ে যায়।

ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যায় কিন্তু কাজ শূন্য। আবার পড়তে বসলে ঠিকমত মনোযোগ না বসায় সময় পেরিয়ে গেলেও পড়া আত্মস্থ হয় না। এর অন্যতম একটি কারণ হতে পারে আপনার সকালের নাস্তা এড়িয়ে যাওয়া। খাওয়া কম হলে  তা শরীরের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে যা মনের জন্যও ক্ষতিকর। তাই এভাবে পড়াশোনাও ভালোভাবে করা যায় না। তাই কাজে বা পড়াশুনায় মনোযোগ বাড়াতে আজ থেকে সকালের নাস্তাকে হ্যাঁ বলুন।

 

মাইগ্রেনের সমস্যা হ্রাস করে

 

মাইগ্রেনের ব্যথায় কাতর অবস্থা!  যাদের মাইগ্রেন আছে তারা খুব ভালোভাবেই বুঝবেন এর ব্যথা কতটা তীব্র। আর এই ব্যথা কমানোর জন্য নিয়মিত ঔষধ খেতে হয়। আর নিয়মিত ঔষধ খেতে খেতে একসময় শরীরে আবার সাইড এফেক্টের সমস্যাও দেখা দেয়। নানান ঝামেলা শুরু হয় তখন। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময়ই ভালো। তাই নিয়মিত সকালের নাস্তা খাওয়া উচিত, যেন মাইগ্রেনের সমস্যা না হয়। তাই এরপর সকালে নাস্তা না খাওয়ার কারণে মাথা ব্যথা করলেই বুঝে নেবেন, পরবর্তীতে এরকম নিয়মিত নাস্তা না খেলে শীঘ্রই মাইগ্রেনের ব্যথা আপনাকে চেপে ধরবে।

 

পুষ্টিবিদরা বলছেন, প্রয়োজনে জোর করে কিছু খান, তাও সকালবেলা না খেয়ে থাকবেন না। কারণ সকাল থেকে শুরু হয় আমাদের কাজ। সকালের নাস্তা শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরী। সকালে স্বাস্থ্যকর নাস্তা আপনাকে পুরো দিন রাখবে সতেজ এবং তরতাজা। সকালের নাস্তা আমাদের দেহের পুরো দিনের এনার্জি ধরে রাখে। যদি সকালে কোন স্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়া হয় তবে দিনের শুরুতেই আপনার দেহ একটি অপূর্ণতা দিয়ে শুরু করে। তাই আজ থেকে সকালের নাস্তাকে ‘হ্যাঁ’ বলুন। 

Shanjana Rahman

Currently studying Sociology at jagannath university .I am a big fan of thriller movies and books . A Believer in Miracles . Never Stop believing .

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter